পশ্চিমবঙ্গের ২০১৬ সালের SSC নিয়োগ মামলায় আপাতত স্বস্তি পেয়েছেন অনিয়মে জড়িত নন এমন যোগ্য শিক্ষকরা। ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত চাকরি বহাল রাখার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আরও সময় চেয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন। এই আবেদনের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত আগের নির্দেশ কার্যকর থাকছে। তবে স্থায়ীভাবে চাকরি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গের ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশন বা SSC নিয়োগ মামলা ফের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর নিয়োগ বাতিলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি জটিলতার মধ্যেই আপাতত কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন সেইসব শিক্ষক, যাঁদের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত তাঁদের চাকরি চালিয়ে যাওয়ার যে সুযোগ আগে দেওয়া হয়েছিল, নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নতুন করে আবেদন করেছে স্কুল সার্ভিস কমিশন।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ৩১ আগস্টের সময়সীমা এসে গেলেই যোগ্য শিক্ষকদের চাকরি যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে — এমন সরল সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার জন্য আরও সময় চেয়ে SSC-র আবেদন আদালতে রয়েছে এবং সেই আবেদনের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত আগের নির্দেশ কার্যকর থাকবে বলে জানা যাচ্ছে।
কোথা থেকে শুরু এই মামলা?
২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক-সহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, বেআইনি সুপারিশ এবং যোগ্যতার বাইরে নিয়োগের অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে পৌঁছয় এবং দীর্ঘ শুনানির পর গোটা নিয়োগপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্ট ২০১৬ সালের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নিযুক্ত প্রায় ২৫,৭৫৩ জনের চাকরি বাতিলের নির্দেশ দেয়। পরে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে যায়। শীর্ষ আদালতও নিয়োগপ্রক্রিয়ার গুরুতর অনিয়মের বিষয়টি বিবেচনা করে চাকরি বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
এই মামলার সবচেয়ে জটিল দিক ছিল — পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম থাকলেও প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন।
‘যোগ্য’ ও ‘অযোগ্য’দের মধ্যে পার্থক্য কেন?
মামলার শুনানিতে আদালতের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এমন শিক্ষক ও কর্মীদের বিষয়টি, যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতি বা নিয়োগে কারচুপির অভিযোগ নেই। তাঁদের ‘untainted’ বা অনিয়মে জড়িত নন — এমন প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই ধরনের যোগ্য শিক্ষকদের একটি সীমিত সময়ের জন্য চাকরি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল, নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলগুলিতে হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক না থাকার পরিস্থিতি তৈরি না করা।
আদালতের এই ব্যবস্থা অবশ্য স্থায়ী চাকরি পুনর্বহাল নয়। বরং নতুন ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বিষয়টি দেখা হয়েছে।
কেন ৩১ আগস্টের সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ?
সুপ্রিম কোর্ট নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল। একই সঙ্গে যোগ্য বলে বিবেচিত পুরনো শিক্ষকরা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্কুলে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান সময়সীমা অনুযায়ী, সেই সুযোগের মেয়াদ ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত। কিন্তু সমস্যার জায়গা হল — এই সময়ের মধ্যে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়ার সব ধাপ শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, কাউন্সেলিং, নথি যাচাই, সুপারিশপত্র এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে এত বড় সংখ্যক শূন্যপদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ নিয়োগ শেষ করা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও সময় চেয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন সুপ্রিম কোর্টের কাছে সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করেছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য আরও সময় চাওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে নতুন নিয়োগে সংরক্ষণনীতি এবং ওবিসি সংক্রান্ত নিয়মের পরিবর্তনও প্রক্রিয়াটিকে প্রভাবিত করছে বলে জানা যাচ্ছে। এই প্রশাসনিক ও আইনি বিষয়গুলি মিটিয়ে পুরো নিয়োগ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন বলে কমিশনের পক্ষ থেকে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
৩১ আগস্ট পার হলে কি চাকরি চলে যাবে?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে উত্তর হল — এই মুহূর্তে এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। যোগ্য শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন ইতিমধ্যেই আদালতে রয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই আবেদনের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত আগের নির্দেশ কার্যকর থাকবে। ফলে ৩১ আগস্টকে সামনে রেখে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে যে নতুন করে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, আপাতত তাতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আদালত তাঁদের স্থায়ীভাবে চাকরিতে বহাল করেছে। বিষয়টি এখনও বিচারাধীন এবং পরবর্তী শুনানিতে আদালত নতুন সময়সীমা বা অন্য কোনও ব্যবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
২৬ হাজারের সবাই কি চাকরিতে থাকবেন?
না। এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। ২০১৬ সালের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মোট প্রায় ২৫,৭৫৩টি নিয়োগ বাতিল হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী আদালতের নির্দেশে যাঁদের ‘যোগ্য’ বা ‘untainted’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই “২৬ হাজার শিক্ষক সবাই আবার চাকরি ফিরে পেলেন” — এমন দাবি সঠিক নয়।
একইভাবে “৩১ আগস্টেই ২৬ হাজারের সবার চাকরি শেষ” — এমন দাবিও বর্তমান পরিস্থিতির পুরো ছবি তুলে ধরে না। আদালতের মূল লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে একদিকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া, অন্যদিকে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার বিষয়টি বিবেচনা করা।
নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব
পুরনো নিয়োগ বাতিলের পর নতুন করে শিক্ষক নিয়োগই এখন পুরো সমস্যার স্থায়ী সমাধানের অন্যতম প্রধান পথ। ইতিমধ্যে নতুন নিয়োগের জন্য পরীক্ষা ও অন্যান্য ধাপ শুরু হয়েছে। একাদশ-দ্বাদশ স্তরে নতুন নিয়োগের ফলও প্রকাশিত হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপ হিসেবে কাউন্সেলিং ও নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
কিন্তু নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, মেধাতালিকা তৈরি, সংরক্ষণনীতি কার্যকর করা এবং সুপারিশের পর নিয়োগপত্র দেওয়ার মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। তাই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগছে।
সামনে কী হতে পারে?
এখন মূল নজর সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের দিকে। আদালতকে একদিকে বিবেচনা করতে হবে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আরও কতটা সময় প্রয়োজন, অন্যদিকে যোগ্য পুরনো শিক্ষকরা সেই সময় পর্যন্ত চাকরি চালিয়ে যেতে পারবেন কি না।
যদি আদালত সময় বাড়ানোর অনুমতি দেয় এবং যোগ্য শিক্ষকদের চাকরি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও বজায় থাকে, তাহলে নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে পারে।
অন্যদিকে, আদালত যদি নতুন কোনও সময়সীমা বা শর্ত নির্ধারণ করে, তাহলে সেই অনুযায়ী রাজ্য সরকার ও SSC-কে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষকদের নজর এখন আদালতে
২০১৬ সালের SSC নিয়োগ মামলা শুধু চাকরি হারানো শিক্ষক বা নতুন চাকরিপ্রার্থীদের বিষয় নয়। এর সঙ্গে রাজ্যের হাজার হাজার স্কুল, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যক্রমও জড়িত।
একদিকে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগের দাবি রয়েছে। অন্যদিকে যাঁরা নিজেদের যোগ্য বলে দাবি করছেন, তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন রয়েছে। ফলে আদালতের সামনে দুটি বিষয়কে একই সঙ্গে সামঞ্জস্য করার বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, ২৬ হাজারের নিয়োগ মামলা এখনও চূড়ান্তভাবে শেষ হয়নি। যোগ্য শিক্ষকরা আপাতত স্বস্তিতে থাকলেও তাঁদের চাকরি স্থায়ীভাবে পুনর্বহাল হয়েছে — এমনটা বলা যাবে না। নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা এবং যোগ্য প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৩১ আগস্টের সময়সীমা ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা তাই আপাতত কিছুটা কমলেও, এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।

