বিজ্ঞানীরা প্রায় ১,৫০০ মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা এবং ৬৩ লক্ষেরও বেশি কোষের জিন-কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে বিশাল জিন-অ্যাটলাস তৈরি করেছেন। এতে বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্কের পরিবর্তন এবং Alzheimer’s, Parkinson’s, schizophrenia-সহ বিভিন্ন রোগে কোষভিত্তিক জিনগত পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের আশা, এই মানচিত্র ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের রোগের কারণ বোঝা, নির্দিষ্ট molecular pathway শনাক্ত করা এবং উন্নত চিকিৎসা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে বয়সের সঙ্গে বদলায়, কোন কোষে কোন জিন সক্রিয় থাকে এবং বিভিন্ন মস্তিষ্কের রোগে সেই জিনের কার্যকলাপে কী পরিবর্তন ঘটে — এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন মানব মস্তিষ্কের অন্যতম বৃহৎ জিন-অ্যাটলাস। প্রায় ১,৫০০ মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা এবং ৬.৩ মিলিয়নেরও বেশি পৃথক কোষের নিউক্লিয়াস বিশ্লেষণ করে তৈরি এই গবেষণা-মানচিত্র Alzheimer’s disease, Parkinson’s disease, schizophrenia-সহ একাধিক জটিল মস্তিষ্কের রোগ বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দরজা খুলতে পারে।
গবেষণাটি ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Nature ও Nature Genetics-এ প্রকাশিত একাধিক গবেষণার মাধ্যমে সামনে এসেছে। গবেষণার পিছনে রয়েছে PsychAD Consortium-এর বিজ্ঞানীরা এবং এটি National Institutes of Health (NIH)-এর অর্থায়নে পরিচালিত বৃহৎ গবেষণা উদ্যোগের অংশ।
মস্তিষ্কের কোন অংশকে কেন্দ্র করে গবেষণা?
গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মস্তিষ্কের prefrontal cortex, বিশেষ করে dorsolateral prefrontal cortex বা DLPFC। মানুষের পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, working memory, মনোযোগ এবং অন্যান্য উচ্চস্তরের মানসিক কার্যকলাপের সঙ্গে এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত।
এই অংশের কার্যকারিতায় পরিবর্তন বিভিন্ন neuropsychiatric এবং neurodegenerative রোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই অঞ্চলের কোষ ও জিনের কার্যকলাপের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা গেলে রোগের সূচনা ও অগ্রগতির পেছনে থাকা molecular পরিবর্তন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
প্রায় ১,৫০০ মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা
এই গবেষণার ব্যাপ্তি বোঝা যায় এর নমুনার সংখ্যা থেকেই। মূল atlas-এ ১,৪৯৪ জন মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা ব্যবহার করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন সুস্থ বা neurotypical ব্যক্তি এবং বিভিন্ন মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত মানুষ। বয়সের ক্ষেত্রেও ছিল ব্যাপক বৈচিত্র্য — শিশু থেকে শুরু করে শতবর্ষের কাছাকাছি বয়সী মানুষ পর্যন্ত।
গবেষণায় Alzheimer’s disease, Parkinson’s disease, Lewy body disease, vascular dementia, frontotemporal dementia, schizophrenia এবং bipolar disorder-সহ একাধিক অবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে একই brain region-এ বিভিন্ন রোগের molecular পরিবর্তন তুলনা করার সুযোগ পেয়েছেন গবেষকরা।
৬.৩ মিলিয়নের বেশি কোষের জিন-কার্যকলাপ বিশ্লেষণ
বিজ্ঞানীরা single-cell বা single-nucleus RNA sequencing প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। সাধারণভাবে কোনও টিস্যু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে সেখানে থাকা বিভিন্ন ধরনের কোষের আলাদা বৈশিষ্ট্য অনেকটাই মিশে যায়। কিন্তু single-cell বা single-nucleus পদ্ধতিতে পৃথক কোষ বা নিউক্লিয়াসের RNA-র কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা যায়।
এই পদ্ধতির সাহায্যে গবেষকরা ৬.৩ মিলিয়নেরও বেশি পৃথক brain cell-এর gene activity বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে neuron-এর পাশাপাশি immune এবং vascular cell-ও ছিল। ফলে মস্তিষ্কের কোন কোষে কোন molecular পরিবর্তন হচ্ছে, তা অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে দেখা সম্ভব হয়েছে।
বয়স বাড়লে মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন হয়?
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মানুষের জীবনকালের সঙ্গে মস্তিষ্কের molecular পরিবর্তন বোঝা। সুস্থ মস্তিষ্কের ২৮৪ জন donor-এর DLPFC বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে gene activity-এর ধরন একরকম থাকে না।
গবেষণায় মোটামুটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় চিহ্নিত হয়েছে। প্রথমদিকে, অর্থাৎ শৈশব ও কৈশোরে মস্তিষ্কে দ্রুত molecular remodelling দেখা যায়। এরপর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের একটি দীর্ঘ সময়ে অনেক পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। পরে প্রায় ৬৫ বছর বয়সের কাছাকাছি থেকে আবার একটি নতুন remodelling phase দেখা যায়।
বয়স্ক বয়সের এই পরিবর্তনের মধ্যে immune activity, stress response এবং circadian rhythm-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কোষ ও gene programme বিশেষভাবে পরিবর্তিত হতে দেখা গেছে।
Alzheimer’s নিয়ে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই গবেষণার অন্যতম সম্ভাব্য ব্যবহার Alzheimer’s disease বোঝার ক্ষেত্রে। এতদিন অনেক গবেষণায় কোনও রোগের সঙ্গে যুক্ত genetic variation বা gene activity চিহ্নিত করা হলেও, সেই পরিবর্তন ঠিক কোন ধরনের brain cell-এ প্রভাব ফেলছে, তা সবসময় পরিষ্কার ছিল না।
নতুন atlas সেই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। গবেষকদের তৈরি disease atlas-এ Alzheimer’s এবং অন্যান্য brain disorder-এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন cell type-এর gene-expression পরিবর্তন তুলনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু shared এবং disease-specific molecular process শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
জেনেটিক ঝুঁকি কোন কোষে কাজ করে?
Nature Genetics-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ১,৩৮৪ জন donor-এর ৫.৬ মিলিয়ন nuclei বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে গবেষকরা মানব prefrontal cortex-এর বিভিন্ন cell type-এ genetic regulation কীভাবে কাজ করে তার একটি multi-ancestry atlas তৈরি করেছেন।
গবেষণায় ১৪,২৫৮টি gene-এর genetic regulation শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু gene-এর regulatory effect নির্দিষ্ট cell class বা subclass-এর সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। গবেষকেরা Alzheimer’s disease, schizophrenia এবং অন্যান্য রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত genetic signal-ও শনাক্ত করেছেন, যা সাধারণ bulk-tissue analysis-এ ধরা পড়ত না।
ভবিষ্যতে কি নতুন চিকিৎসা আসতে পারে?
গবেষণাটি সরাসরি কোনও নতুন চিকিৎসা আবিষ্কারের দাবি করছে না। বরং এটি এমন একটি বিশাল reference map, যা ভবিষ্যতের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
NIH-এর মতে, এই ধরনের high-resolution molecular atlas বিজ্ঞানীদের রোগের biological mechanism আরও ভালোভাবে বুঝতে এবং ভবিষ্যতে diagnosis, prevention ও treatment-এর সম্ভাব্য নতুন পথ খুঁজতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে precision medicine-এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট cell type বা molecular pathway লক্ষ্য করে চিকিৎসা তৈরির গবেষণায় এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি
তবে এই আবিষ্কারকে Alzheimer’s-এর সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। গবেষণায় মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলেও মানুষের সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের প্রতিটি অঞ্চল ও প্রতিটি কোষের পূর্ণ চিত্র এখনও পাওয়া যায়নি। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরাও উল্লেখ করেছেন যে পুরো চিত্র বুঝতে আরও brain region-এর প্রয়োজন হবে।
তাছাড়া মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল। বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ এবং রোগ — সবকিছুর প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে। তাই নতুন atlas থেকে পাওয়া সম্পর্কগুলি ভবিষ্যৎ গবেষণায় আরও যাচাই করতে হবে।
বিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দরজা
মানব মস্তিষ্কের এই বিশাল জিন-অ্যাটলাস মূলত বিজ্ঞানীদের হাতে একটি নতুন গবেষণা-মানচিত্র তুলে দিয়েছে। কোন কোষ কীভাবে কাজ করছে, বয়সের সঙ্গে তার পরিবর্তন কী এবং রোগের ক্ষেত্রে কোন molecular pathway বদলে যাচ্ছে — এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন আরও নির্দিষ্টভাবে সম্ভব হবে।
বিশেষ করে Alzheimer’s, Parkinson’s, schizophrenia এবং অন্যান্য জটিল brain disorder-এর ক্ষেত্রে রোগের molecular ভিত্তি বোঝার জন্য এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে। আগামী দিনে এই তথ্যের সঙ্গে imaging, genetics এবং অন্যান্য biological data যুক্ত হলে মস্তিষ্কের রোগ সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ, বিজ্ঞানীরা এখনও Alzheimer’s-এর সরাসরি নিরাময় খুঁজে পাননি। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কের কোটি কোটি কোষের মধ্যে কোন কোষে কী পরিবর্তন হচ্ছে — সেই জটিল ধাঁধার একটি বড় অংশের মানচিত্র এখন তৈরি হয়েছে। আর সেখান থেকেই ভবিষ্যতের নতুন গবেষণা ও চিকিৎসার পথ তৈরি হতে পারে।

