নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী, SIR এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মামলায় SIR প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটার অধিকার এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং Special Intensive Revision বা SIR-কে কেন্দ্র করে নতুন করে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং SIR প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
মামলাকারীর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং SIR-সংক্রান্ত কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য নির্বাচন কমিশনারদের আপত্তি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
SIR ঘিরেই মূল বিতর্ক
ভোটার তালিকার Special Intensive Revision বা SIR হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ভোটার তালিকার তথ্য নতুন করে যাচাই ও সংশোধন করা হয়। এর উদ্দেশ্য সাধারণত প্রকৃত ভোটারদের তালিকায় রাখা এবং মৃত, স্থানান্তরিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম শনাক্ত করা। তবে পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মামলাকারীর দাবি, SIR-এর সময় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে প্রকৃত ভোটাররা যাতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। ভোটার তালিকা সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং বাদ পড়া ভোটারদের আপিলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও মামলায় গুরুত্ব পেয়েছে।
কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের অভিযোগ
মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে ওঠা প্রশ্ন। অভিযোগ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকা, Form 6 এবং SIR-সংক্রান্ত বিষয়ও ছিল বলে দাবি মামলাকারীর।
২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act-এর বিধান উল্লেখ করে মামলাকারী বলেছেন, কমিশনের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে। তাই কোনও সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়েছে।
CEC-এর বিরুদ্ধে কী দাবি?
মামলায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি পরীক্ষা করার জন্য স্বাধীন তদন্তের কথাও বলা হয়েছে।
মামলাকারীর আরও দাবি, SIR-এর মাধ্যমে যেসব ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, সেই প্রক্রিয়াটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। প্রয়োজনে Special Investigation Team বা SIT কিংবা বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের আবেদনও করা হয়েছে।
এছাড়া ভোটার সংক্রান্ত তথ্যের ডিজিটাল রেকর্ড, ডেটা এবং সংশ্লিষ্ট সার্ভার-লগ সংরক্ষণ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করার দাবিও মামলায় রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পরিবর্তিত Form 6-এর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে আগের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পুরো বিতর্কে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। SIR-এর পর রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম নিয়ে আপত্তি বা বাদ পড়ার বিষয় সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটার পুনরায় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের আগে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম যাতে ভুলবশত বাদ না যায়, সেটিই এখন অন্যতম বড় প্রশ্ন।
নির্বাচন কমিশনের তরফে অবশ্য ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে নিয়ম মেনে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, যোগ্য ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং তালিকাকে নির্ভুল রাখাই এই ধরনের সংশোধন প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য।
আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া এই মামলার গুরুত্ব এখানেই যে, এটি শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা এবং ভোটার তালিকা তৈরির স্বচ্ছতা।
তবে মামলাকারীর অভিযোগকে আদালত সত্য বলে গ্রহণ করেছে — এমনটা এখনও বলা যায় না। বিষয়টি বিচারাধীন এবং আদালতের পরবর্তী শুনানি ও নির্দেশের পরই অভিযোগগুলির আইনি অবস্থান স্পষ্ট হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জবাব দেওয়া জরুরি। কারণ ভোটার তালিকার সামান্য ভুলও একজন নাগরিকের ভোটাধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে।
সামনে কী?
এখন নজর থাকবে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকে। আদালত যদি অভিযোগগুলির বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং SIR-এর কার্যপ্রণালী আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হতে পারে।
অন্যদিকে, আদালত যদি কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলেও ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়ম এবং আপিল প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে এই মামলা ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন এবং SIR-এর প্রভাবের দিকে এখন রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার — সবার নজর।

