বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে আগের সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে। এই উদ্যোগের খবর প্রকাশ্যে আসার পর ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চুক্তিগুলির ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি করেছে।

ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে কূটনৈতিক নজর তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে আগের সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত ১০১টি সমঝোতা স্মারক (MoU) ও চুক্তি পর্যালোচনা করছে, এমন খবর প্রকাশ্যে আসার পরই বিষয়টি নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।
এই মন্তব্যের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও সব চুক্তি বাতিল বা পরিবর্তনের কোনও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি, তবুও ১০১টি চুক্তি একসঙ্গে পর্যালোচনার সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
১০১টি চুক্তি কেন পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গত ১১ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে আগের সরকারের সময়ে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন কোন চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কোথাও কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য বলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মনি জানিয়েছেন, সব চুক্তি বাতিল করার কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং চুক্তিগুলির বিভিন্ন শর্ত পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার বিষয়টি দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ রাখার পাশাপাশি দেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের মতো বিষয়ও এই পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে বলে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে। এর ফলে শুধু বাণিজ্য নয়, দুই দেশের যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কী বলেছে ভারত?
বাংলাদেশের এই পর্যালোচনার খবর সামনে আসার পর ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের নিয়মিত সাংবাদিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জবাবে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, নয়াদিল্লি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সম্পর্কে অবগত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই মন্তব্যকেই বাংলাদেশের ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে নয়াদিল্লির সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ভারতের বক্তব্যকে সরাসরি সামরিক বা সংঘাতের হুমকি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা — দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে একতরফা পরিবর্তন বা এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হলে যাতে ভারতের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় ব্যবস্থা নেবে।
কোন কোন ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে?
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গত কয়েক বছরে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিকাঠামো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বন্দর ব্যবহার ও নদীর জলবণ্টনসহ একাধিক ক্ষেত্রে চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে। ফলে ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা শেষ পর্যন্ত কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে বন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে যে কোনও পরিবর্তনের প্রভাব দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে। একইভাবে বিদ্যুৎ ও পরিকাঠামো-সংক্রান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনা শুরু হলে চলমান প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামোতেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ট্রানজিট ফি, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং সীমান্ত নিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়েও সম্ভাব্য পুনর্বিবেচনার কথা উঠে এসেছে।
তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও কোন নির্দিষ্ট চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করা হবে, তার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তাই এখনই কোনও নির্দিষ্ট চুক্তির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
‘সব চুক্তি বাতিল নয়’, বার্তা ঢাকার
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, পর্যালোচনার লক্ষ্য সব চুক্তি বাতিল করা নয়। বরং যেসব চুক্তিতে অসঙ্গতি রয়েছে বা বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও বিধান রয়েছে, সেগুলি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
পরবর্তীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, পর্যালোচনার উদ্দেশ্য এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যাতে চুক্তিগুলি দুই দেশের জন্যই কার্যকর ও লাভজনক হয়। অর্থাৎ, এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখার পরিবর্তে বাংলাদেশের নতুন সরকারের নীতিগত পুনর্মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গঙ্গার জলবণ্টন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সময়
১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা।
এই বিষয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে জলসম্পর্কিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যৌথ ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকের প্রক্রিয়া কার্যকর রয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে।
গঙ্গার জলবণ্টনের পাশাপাশি তিস্তা-সহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর জল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ফলে একদিকে ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা, অন্যদিকে জলবণ্টন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময়সীমা — দুই বিষয়ই ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতিকে আগামী দিনে প্রভাবিত করতে পারে।
সম্পর্ক কি আরও কঠিন পর্যায়ে যাবে?
১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা এবং ভারতের সতর্কবার্তা নিঃসন্দেহে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অবিলম্বে সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, সীমান্ত, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জল এবং নিরাপত্তার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের স্বার্থেই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলি সমাধান করার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ যেমন তার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে, তেমনই ভারতও নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এখন মূল প্রশ্ন, পর্যালোচনা শেষে ঢাকা কোন কোন চুক্তিতে পরিবর্তন আনতে চায় এবং সেই প্রস্তাবগুলি নয়াদিল্লির সঙ্গে কীভাবে আলোচনায় আনা হয়।
সব মিলিয়ে, ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং ভারতের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ — দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে, তা অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে।

