১৩ বছর পর ফের রাইটার্স বিল্ডিংয়ে মন্ত্রীদের দফতর ফেরাতে প্রশাসনিক ব্যস্ততা

- Advertisement -

প্রায় ১৩ বছর পর ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফের প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হতে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী-সহ একাধিক মন্ত্রী এবং শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের জন্য অফিস তৈরির কাজ চলছে। ৯ অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিক সংস্কার শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে পুরো সচিবালয় নবান্ন থেকে রাইটার্সে সরছে না। ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণ ও আধুনিক প্রশাসনিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

১৩ বছর পর ফের রাইটার্স বিল্ডিংয়ে মন্ত্রীদের দফতর ফেরাতে প্রশাসনিক ব্যস্ততা

দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। ফের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় হতে চলেছে কলকাতার ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিং। মুখ্যমন্ত্রী-সহ একাধিক মন্ত্রী এবং শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের জন্য ভবনের ভিতরে নতুন করে অফিস ও চেম্বার তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সবকিছু নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দুর্গাপুজোর আগেই এই পর্যায়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিবালয় রাইটার্স বিল্ডিং থেকে হাওড়ার নবান্নে স্থানান্তরিত হয়। তারপর থেকেই ঐতিহাসিক এই ভবনটি প্রশাসনের মূল কেন্দ্র হিসেবে আর ব্যবহার করা হয়নি। যদিও বিভিন্ন সময়ে ভবনের কিছু অংশে সরকারি কাজ চলেছে, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নিয়মিত প্রশাসনিক কাজকর্মের কেন্দ্র হিসেবে রাইটার্স আর আগের অবস্থানে ছিল না। এবার সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী-সহ একাধিক মন্ত্রীর জন্য তৈরি হচ্ছে অফিস

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাইটার্স বিল্ডিংয়ে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য পৃথক অফিসের পাশাপাশি আরও পাঁচজন মন্ত্রীর চেম্বার প্রস্তুত করা হচ্ছে। যাঁদের জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পূর্তমন্ত্রী অজয় পোদ্দার, পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, পর্যটন ও পরিষদীয় মন্ত্রী শংকর ঘোষ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।

মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ের জন্যও একাধিক কক্ষ প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদাধিকারীদের জন্য পৃথক অফিস তৈরির কাজ চলছে। অর্থাৎ শুধু রাজনৈতিক স্তরের দফতর নয়, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তরের জন্যও রাইটার্সে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অক্টোবরের শুরুতেই কাজ শেষ করার লক্ষ্য

রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কার ও অফিস তৈরির কাজের অগ্রগতি নিয়ে সম্প্রতি পূর্ত দফতরের তরফে পর্যালোচনা করা হয়েছে। দফতরের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অসম্পূর্ণ কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৯ অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করে ভবনটি প্রশাসনের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে। মহালয়া ১০ অক্টোবর হওয়ায় দুর্গাপুজোর আগে নতুন দফতরগুলি প্রস্তুত করার বিষয়টিই এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে নির্দিষ্ট তারিখে মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা নিয়মিতভাবে সেখানে বসা শুরু করবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। ফলে এখনই পুরো প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্ন থেকে রাইটার্সে স্থানান্তরিত হচ্ছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

২০১৩ সালের পর বদলে গিয়েছিল প্রশাসনিক ঠিকানা

রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ইতিহাস ও রাজনৈতিক ইতিহাস গভীরভাবে জড়িত। ১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মীদের জন্য এই ভবনের প্রাথমিক নির্মাণ শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক সদর দফতর। ২০১৩ সালে সচিবালয় নবান্নে স্থানান্তরিত হওয়ার পর রাইটার্সের প্রশাসনিক গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়।

প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো এই ভবনটি শুধু একটি সরকারি অফিস নয়, কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপত্যও। তাই ভবনটিকে নতুন করে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করার পাশাপাশি তার ঐতিহ্য সংরক্ষণও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্কারে ঐতিহ্য রক্ষাই বড় পরীক্ষা

রাইটার্স বিল্ডিং সংস্কারের ক্ষেত্রে আধুনিক অফিসের প্রয়োজনীয়তা এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের চরিত্র — দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পূর্ত দফতরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সংস্কারের সময় ভবনের কিছু পুরনো স্থাপত্য উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে গিয়েছিল। ইউরোপীয় টাইলস-সহ কিছু ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।

ফলে এবার সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু অফিস ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাই নয়, ভবনের ঐতিহাসিক চরিত্র যতটা সম্ভব বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বড় সংস্কার প্রকল্পে বেসরকারি অংশগ্রহণের সম্ভাবনা

রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি এবং সামগ্রিক সংস্কারের জন্য বেসরকারি উদ্যোগের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি গোষ্ঠী কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা CSR-এর আওতায় প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারকাজে যুক্ত হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে খবর, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।

এই সম্ভাব্য প্রকল্পের সঙ্গে স্থপতি রঞ্জন মিত্রের নামও সামনে এসেছে। তিনি আগে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। রাইটার্সের ঐতিহাসিক কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে ভবিষ্যতের প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটানোই এই সংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।

এখনই কি নবান্ন পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত ‘না’। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে মুখ্যমন্ত্রী, কয়েকজন মন্ত্রী এবং শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের জন্য নির্দিষ্ট অফিস প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি রাইটার্স বিল্ডিংয়ের আংশিক প্রশাসনিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুরো সচিবালয়ের সব দফতর নবান্ন থেকে রাইটার্সে সরিয়ে নেওয়া হবে কি না, হলে কবে হবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে আপাতত লক্ষ্য হচ্ছে ঐতিহাসিক ভবনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আবার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী করে তোলা।

নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে বি-বা-দী বাগ

রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফের মন্ত্রী ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়মিত উপস্থিতি শুরু হলে কলকাতার বি-বা-দী বাগ এলাকার প্রশাসনিক গুরুত্বও বাড়তে পারে। সরকারি কর্মী, আধিকারিক, রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।

সব মিলিয়ে ১৩ বছর পর রাইটার্স বিল্ডিংকে ঘিরে যে নতুন করে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে, তা কলকাতার প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই প্রত্যাবর্তন কতটা বিস্তৃত হবে এবং ভবিষ্যতে রাইটার্স বিল্ডিং আবার রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক সদর দফতরে পরিণত হবে কি না, সেই উত্তর নির্ভর করবে পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্ত ও সংস্কার পরিকল্পনার উপর।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -