নেপালে হিমবাহ ধস, পাথর ও বরফের স্রোত থেকে ভয়াবহ হড়পা বানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। বহু মানুষ নিখোঁজ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ভারত ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম সতর্কতা, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি কিছুটা কমানো সম্ভব ছিল।

হিমালয়ের কোলে ফের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হঠাৎ হিমবাহ ধস, বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফের স্রোত এবং তার পরবর্তী ভয়াবহ হড়পা বানে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ২৬ আগস্টের এই বিপর্যয়ে নেপালে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৯০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। শত শত মানুষ আহত এবং ৯০০-র বেশি মানুষ নিখোঁজ বলে জানা যাচ্ছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কীভাবে ঘটল এই ভয়াবহ বিপর্যয়?
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয় বলে মনে করা হলেও পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক ও উপগ্রহ-তথ্য বিশ্লেষণে অন্য ছবি সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একটি বিশাল হিমবাহের অংশ আচমকা ভেঙে নেমে আসে। সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধসের উপাদান নদীর গতিপথে প্রবেশ করে।
এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে নদীতে বিপুল পরিমাণ জল ও ধ্বংসাবশেষ জমে ভয়াবহ স্রোত তৈরি হয়। সেই স্রোত নিচের দিকে নেমে আসার সময় নদীর দুই তীরের বসতি, সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য পরিকাঠামোকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
অর্থাৎ, এই বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক কারণ শুধুমাত্র অতিবৃষ্টি নয়। হিমবাহের ধস এবং তার ফলে তৈরি বিশাল ধ্বংসাবশেষের স্রোতই মূল ট্রিগার হিসেবে উঠে এসেছে। তবে হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ভূখণ্ডের অস্থিতিশীলতা এই ধরনের বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে?
এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নেপালের রাসুওয়া ও আশপাশের এলাকায়। প্রবল জলস্রোত এবং কাদামাটি-পাথরের ধাক্কায় একাধিক রাস্তা ও সেতু ভেসে গিয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছতেও সমস্যায় পড়ছে।
নেপালে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত, প্রায় ৪৬০ জন আহত এবং প্রায় ৯১০ জন নিখোঁজ বলে সর্বশেষ সরকারি হিসাবের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলি জানিয়েছে। একই বিপর্যয়ে তিব্বতেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। ফলে গোটা হিমালয় সীমান্ত অঞ্চলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিও এই বিপর্যয়ের প্রভাবে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকদেরও একটি বড় অংশ নিখোঁজ বা বিপর্যস্ত এলাকায় আটকে পড়েছেন বলে জানা গিয়েছে। ফলে নেপালের পাশাপাশি ভারত, আমেরিকা-সহ একাধিক দেশের প্রশাসনের কাছেও এই বিপর্যয় বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালকে কীভাবে সাহায্য করছে ভারত?
প্রতিবেশী দেশ হিসেবে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। বিপর্যয়ের পরপরই ভারত জরুরি ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারত নেপালের জন্য প্রায় ৫০ মেট্রিক টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এর মধ্যে বিপর্যয় মোকাবিলা ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী রয়েছে।
শুধু ত্রাণ পাঠানোই নয়, নেপালে আটকে পড়া বা নিখোঁজ ভারতীয় নাগরিকদের খোঁজ নেওয়ার জন্য ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ২৪ ঘণ্টার বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করেছে। উদ্ধার, যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ক্ষেত্রে নেপালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করাও এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলির পরিস্থিতিও নজরে রাখা হচ্ছে। নেপাল থেকে অতিরিক্ত জল নেমে আসার ফলে ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের নদীগুলিতে কোনও প্রভাব পড়ে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। ভারতের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা NDRF-ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে।
আগে থেকে সতর্ক হলে কি ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত?
এই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপর্যয় পুরোপুরি আটকানো সম্ভব না হলেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারত।
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, হিমবাহ-হ্রদ এবং পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। উপগ্রহ, রাডার, ভূকম্পন-পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় জলস্তর মাপার যন্ত্র ব্যবহার করে সম্ভাব্য বিপদের আগাম সংকেত পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে বিপজ্জনক হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষের জন্য দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে অনেক মানুষকে আগেই নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনায় বিপদের মাত্রা এতটাই আকস্মিক ছিল যে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক মিনিটের সতর্কতাও সবক্ষেত্রে যথেষ্ট নাও হতে পারত। পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের আকস্মিক ধস এবং তার সঙ্গে বিপুল পাথর-বরফ নেমে এলে নদীর জলস্তর অত্যন্ত দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু পূর্বাভাস নয়, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানো এবং আগে থেকেই নির্ধারিত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা?
হিমালয়ের এই বিপর্যয় নতুন করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও বরফ গলার ফলে নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে বা পুরনো হ্রদের আয়তন বাড়ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের বরফ ও মাটির বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়লে ধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে কোনও একটি নির্দিষ্ট বিপর্যয়কে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বরং বলছেন, উষ্ণায়ন হিমালয়ের ভূপ্রকৃতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাব্যতা ও তীব্রতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়; গোটা হিমালয় অঞ্চলের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। ভারত, নেপাল, ভুটান ও চিনের মতো হিমালয়-সংলগ্ন দেশগুলির মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান, উপগ্রহ-নির্ভর পর্যবেক্ষণ এবং যৌথ দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
নদীর উজানে বিপদের সংকেত তৈরি হলে ভাটির এলাকার মানুষকে দ্রুত সতর্ক করার জন্য সীমান্ত পেরিয়ে সমন্বিত আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর ও পাহাড়ি ঢালে অপরিকল্পিত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও জরুরি।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতির শক্তিকে থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আগাম সতর্কতা এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার মাধ্যমে তার ভয়াবহ পরিণতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলিতে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী দুর্যোগ-প্রস্তুতি গড়ে তোলাই হবে নেপাল এবং সমগ্র হিমালয় অঞ্চলের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

