গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মাঝেই হাসিনার ফেরার বার্তা, নতুন চাপে বিএনপি সরকার?

- Advertisement -

বিএনপি সরকার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অর্থনৈতিক চাপ ও বিরোধী আন্দোলন সামলাতে ব্যস্ত। এর মধ্যেই শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর প্রত্যাবর্তন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, চলমান বিচারপ্রক্রিয়া এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব এখনই নিশ্চিত নয়; পরিস্থিতি নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়া, দলীয় সংগঠন ও জনসমর্থনের ওপর।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মাঝেই হাসিনার ফেরার বার্তা, নতুন চাপে বিএনপি সরকার?
Sheikh Hasina’s possible return to Bangladesh amid growing political and economic pressure on the BNP-led government.

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্ন। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। অন্যদিকে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকার সংসদে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিরোধীদের রাজপথের কর্মসূচি নিয়ে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ফেরার বিষয়টি ক্ষমতায় ফেরার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ভারতের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধের কারণে বিষয়টি এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

বিএনপি সরকারের সামনে জ্বালানি সংকট

বর্তমান সময়ে বিএনপি সরকারের জন্য সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যাগুলোর একটি হল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা তৈরি হয়েছে। শিল্পখাতেও এর প্রভাব পড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্ন দেশের শিল্পোৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা LNG-এর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন সরাসরি দেশের ওপর প্রভাব ফেলছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, আমদানি নির্ভরতা এবং অতীতের জ্বালানি নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি ও আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা এর অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো সরকারের ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমালোচনা করছে। সংসদে বিরোধী পক্ষ স্থায়ী বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, শুধু অতীত সরকারকে দায়ী না করে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

রাজপথেও বাড়ছে চাপ

জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে কর্মসূচি শুরু করেছে। দীর্ঘ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের দাবি জানানো হচ্ছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিরোধীদের আন্দোলনের অধিকার স্বীকার করলেও বলেছেন, শুধু কর্মসূচি না দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের বিকল্প পরিকল্পনাও বিরোধীদের দেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিকল্পিতভাবে অচলাবস্থা তৈরি করা উচিত নয়।

ফলে সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে, একদিকে বাস্তব জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে সেই সংকটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আন্দোলন সামলানো।

এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে শেখ হাসিনার প্রশ্ন

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন সরাসরি বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভূমিকার প্রশ্নটিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। ফলে বর্তমান সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অন্য বিরোধী দলগুলো থেকে আসছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান, দলটির সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।

বিশেষ করে বর্তমান সরকার যখন অর্থনীতি, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার মুখে, তখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক প্রচার আরও সক্রিয় হতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ বাস্তবে কতটা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে পারবে, সেটি নির্ভর করবে দলটির আইনি ও সাংগঠনিক অবস্থার ওপর।

বিচার প্রক্রিয়াই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হল তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ফলে তিনি দেশে ফিরলে তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে। সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে আইনি প্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে তা দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যে থাকে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন কম থাকে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও বাড়ছে গুরুত্ব

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে আসছে। ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের বিষয়টি একটি আইনি বিষয় এবং তা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনাসহ ভারতে থাকা অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের হস্তান্তর দুই দেশের সম্পর্ক সহজ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। অর্থাৎ ঢাকা এখন প্রত্যর্পণের প্রশ্নটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোচনায় আরও স্পষ্টভাবে সামনে আনছে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত নয় এবং তিনি নিজেই দেশে ফিরতে চান। এই দুই অবস্থানের পার্থক্যই আগামী দিনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপির জন্য সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ

বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন বিএনপি সরকারের সামনে একাধিক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

প্রথমত, সরকার যদি জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত সামাল দিতে না পারে, তাহলে বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার করার সুযোগ পাবে।

দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিধি বাড়তে পারে।

তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রশ্ন আরও বেশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হতে পারে।

চতুর্থত, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসতে পারে। এতে সরকারকে একই সঙ্গে আইনগত ও রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

তবে এসব সম্ভাবনাকে নিশ্চিত রাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বাস্তবে কীভাবে ঘটবে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে এবং জনগণের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে — এসব বিষয় এখনও অনিশ্চিত।

সামনে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন তিনটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে থাকবে। প্রথমত, দেশের গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কত দ্রুত কমে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলগুলোর রাজপথের কর্মসূচি কতটা বিস্তৃত হয়। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা বাস্তবে কোন পর্যায়ে পৌঁছায়।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে থাকলেও তাঁর প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকার যখন জ্বালানি সংকট ও বিরোধী আন্দোলনের চাপ সামলাচ্ছে, তখন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা কঠিন।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির মূল প্রশ্ন সরকার পতন নয়; বরং বিএনপি সরকার কীভাবে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করে, বিরোধী আন্দোলন সামলায় এবং একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ পরিচালনা করে — সেদিকেই এখন নজর বাংলাদেশের রাজনীতির।

আগামী কয়েক মাসে এই তিনটি ক্ষেত্র — জ্বালানি সংকট, বিরোধী রাজনীতি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন — পরস্পরের সঙ্গে কতটা যুক্ত হয়, সেটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -