ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতিদের তৎপরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলছে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্কও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে হুতিদের ভূমিকা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সংঘাত, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তাদের অবস্থান — সব মিলিয়ে হুতিদের ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। এর প্রভাব পড়ছে পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলির কূটনীতিতেও।
হুতি কারা?
হুতি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে জায়দি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৯০-এর দশকে হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নেতৃত্বে সংগঠনটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটি শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়।
হুসেইন আল-হুতির মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আবদুল-মালিক আল-হুতি সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। তাঁর নেতৃত্বেই হুতিরা ইয়েমেনের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব অনেকটা বাড়িয়ে নেয়।
তবে হুতিদের শুধুমাত্র ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ইয়েমেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ — এসব বিষয়ও হুতিদের জনপ্রিয়তা ও শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
হুতিরা আসলে কী চায়?
হুতিদের লক্ষ্য নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকলেও কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, তারা ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়। দ্বিতীয়ত, তারা বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে এবং নিজেদেরকে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। তৃতীয়ত, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
হুতিদের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপকে তারা ইয়েমেনের বিরুদ্ধে বিদেশি আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করে।
২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দেশটির বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে। এরপর ইয়েমেন কার্যত একাধিক শক্তির মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধ কেন?
হুতি ও সৌদি আরবের সংঘাতের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ২০১৪ সালে হুতিরা সানা দখল করার পর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বিপাকে পড়ে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল হুতিদের সামরিক অগ্রগতি থামানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে পুনরায় শক্তিশালী করা।
কিন্তু সৌদি আরবের কাছে বিষয়টি শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইয়েমেন সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত। ফলে সেখানে ইরান-ঘনিষ্ঠ একটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্ষমতাবান হয়ে উঠলে তা সৌদি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করতে পারে বলে রিয়াদ মনে করে।
যুদ্ধ চলাকালীন হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতা তৈরি করে। সৌদি আরবও ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান অভিযান চালায়। এর ফলে সংঘাত আরও ভয়াবহ আকার নেয়।
অর্থাৎ, ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই ধীরে ধীরে পরিণত হয় সৌদি আরবের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের লড়াইয়ে।
ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক
হুতি সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইরান। ইরান ও হুতিদের মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে হুতিদের অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। তেহরান অবশ্য হুতিদের সঙ্গে তার সম্পর্ককে সৌদি ও পশ্চিমা দেশগুলির বর্ণনার মতো সরলভাবে দেখার বিরোধিতা করে।
হুতিদের পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন সংগঠন হিসেবে দেখা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারণ ইয়েমেনের স্থানীয় রাজনীতি এবং হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান-হুতি সম্পর্ক অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ ইয়েমেনে হুতিদের শক্তি যত বাড়বে, সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তের কাছে ইরানের প্রভাব তত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
এ কারণেই ইয়েমেনের সংঘাতকে অনেক সময় বৃহত্তর সৌদি-ইরান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়।
লোহিত সাগরে হুতিদের গুরুত্ব কেন এত বেশি?
বর্তমান সময়ে হুতিদের গুরুত্ব শুধু ইয়েমেনের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর অন্যতম কারণ হলো তাদের ভৌগোলিক অবস্থান।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল লোহিত সাগরের পাশে। এর কাছেই রয়েছে বাব আল-মান্দাব প্রণালী, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এই নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনে সময় এবং খরচ দুটোই বাড়তে পারে। জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হলে জ্বালানি ও বিমা খরচও বেড়ে যায়।
এই কারণেই হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ড এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
পাকিস্তান কেন সমস্যায়?
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বহু পুরনো এবং ঘনিষ্ঠ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক কৌশল—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দুই দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইরানের সঙ্গে তার ভৌগোলিক প্রতিবেশী সম্পর্ক।
পাকিস্তান যদি সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। আবার সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও বড় সংকট তৈরি হলে ইসলামাবাদের ওপর রিয়াদের পাশে দাঁড়ানোর চাপও বাড়বে।
এই দ্বৈত চাপের কারণে পাকিস্তান সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক সমাধান ও মধ্যস্থতার পথকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।
ইসলামাবাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হল — সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখা, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনও সংঘাতে না জড়ানো যা ইরান-পাকিস্তান সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তুরস্ক কেন অস্বস্তিতে?
তুরস্কের অবস্থানও কম জটিল নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আঙ্কারা সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে এগিয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে নামা তুরস্কের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তুরস্ক একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করতে পারে না। অন্যদিকে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রাখতে চায় আঙ্কারা।
তাই সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকলেও তুরস্কের সামনে বড় প্রশ্ন হল — কীভাবে সৌদির পাশে থাকা যায়, অথচ সরাসরি ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়ানো যায়।
সামনে কী হতে পারে?
হুতি-সৌদি সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতা, ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
যদি সংঘাত সীমিত থাকে, তাহলে পাকিস্তান ও তুরস্ক কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু সৌদি ভূখণ্ডে বড় হামলা, লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত তৈরি হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হল, ইয়েমেনের সংঘাত আবারও বহু দেশের সরাসরি বা পরোক্ষ অংশগ্রহণে বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
তাই হুতিদের প্রশ্নকে শুধু ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ এবং পাকিস্তান-তুরস্কের কৌশলগত ভারসাম্য।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সমীকরণে একটি পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ অন্য একাধিক দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে হুতি-সৌদি সংঘাতের ভবিষ্যৎ শুধু ইয়েমেনের জন্য নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

