নয়াদিল্লিতে BRICS সম্মেলনের পর বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের কূটনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখেও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখছে দিল্লি। Global South-এর নেতৃত্ব, রাষ্ট্রসংঘ সংস্কার, সমুদ্র নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে ভারতের সক্রিয় ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছে। BRICS-কে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে বিশ্বমঞ্চে প্রভাব বাড়ানোই এখন ভারতের অন্যতম লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্রুত বদলাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্যিক উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তির প্রভাব — সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুমেরুকেন্দ্রিক। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে সদ্য শেষ হওয়া ১৮তম BRICS Summit ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের শেষে গৃহীত হয়েছে ‘New Delhi Declaration’। ১৪০ অনুচ্ছেদের এই ঘোষণাপত্রে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শান্তি ও নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, জলবায়ু এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির মতো একাধিক বিষয়ে সদস্য দেশগুলি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
ভারতের জন্য এই সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু BRICS-এর এক বছরের সভাপতিত্ব সফলভাবে শেষ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কূটনৈতিক পরিসর কতটা বিস্তৃত করা যায়, তারও একটি বড় পরীক্ষা ছিল এই সম্মেলন।
এক মঞ্চে রাশিয়া, চীন, ইরান ও অন্যান্য শক্তি
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে BRICS-এর সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্য যথেষ্ট। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র সংঘাতে জড়িত এবং চীন ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে BRICS-এর মধ্যেই এমন দেশ রয়েছে, যাদের নিজেদের মধ্যেও আঞ্চলিক মতপার্থক্য রয়েছে।
এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও নয়াদিল্লিতে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করানো ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে মতপার্থক্যের মধ্যেও সদস্য দেশগুলি সর্বোচ্চ সংযম, আলোচনা ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের কাছে এখানেই ভারতের ভূমিকার বিশেষ গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে। নয়াদিল্লি কোনও নির্দিষ্ট শক্তিশিবিরের হয়ে কথা না বলে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
Global South-এর কণ্ঠস্বর হওয়ার চেষ্টা
BRICS-এর বর্তমান সম্প্রসারণের ফলে সংগঠনটি বিশ্বের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির একটি বড় অংশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত BRICS-কে শুধু কয়েকটি দেশের অর্থনৈতিক জোট হিসেবে নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বের বৃহত্তর স্বার্থ তুলে ধরার একটি মঞ্চ হিসেবেও দেখতে চাইছে।
New Delhi Declaration-এ উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবিও তোলা হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে। ঘোষণাপত্রে চীন ও রাশিয়া ভারত ও ব্রাজিলের নিরাপত্তা পরিষদে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক দাবির ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, আবার সহযোগিতাও
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ চীন। সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতিতে দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে BRICS, G20, SCO এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক মঞ্চে দুই দেশকে পাশাপাশি কাজ করতে হয়।
BRICS সম্মেলনের সময় ভারত ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্মেলনের আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ভারত-চীন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশের সমস্ত মতপার্থক্য দূর হয়ে গেছে। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের কৌশল হচ্ছে, যেখানে প্রতিযোগিতা রয়েছে সেখানে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা এবং যেখানে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে সেখানে তা কাজে লাগানো।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কেও ভারসাম্যের নীতি
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক BRICS-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা করেছে। একই সময়ে ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সমুদ্রপথে যে প্রভাব পড়ছে, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও ভারত পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। ফলে নয়াদিল্লির নীতিতে ‘একটি শিবির বেছে নেওয়া’র বদলে ‘নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা’র প্রবণতা স্পষ্ট।
আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগত স্বাধীনতা
ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার এবং BRICS-এর অন্যতম প্রধান সদস্য। ফলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সামনে বড় প্রশ্ন, কীভাবে দুই ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যায়।
এই জায়গায় ভারতের ‘Strategic Autonomy’ নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভারত পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে সহযোগিতা করছে; আবার BRICS-এর মাধ্যমে রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গেও যোগাযোগ গভীর করছে।
BRICS-এর ঘোষণাপত্রে একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্যিক বাধার বিরোধিতা এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলি বিশ্ব বাণিজ্যে স্থিতিশীলতার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
সমুদ্র নিরাপত্তায় ভারতের নতুন উদ্যোগ
BRICS সম্মেলনে ভারতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল সমুদ্রপথে কর্মরত নাবিকদের নিরাপত্তা জোরদার করার প্রস্তাব। প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘Seafarers’ Emergency Support Network’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং লোহিত সাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা সংকটের সময় এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় প্রশিক্ষিত নাবিক সরবরাহকারী দেশ হওয়ায় সমুদ্র নিরাপত্তা ও নাবিকদের সুরক্ষার প্রশ্নটি নয়াদিল্লির কাছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত — দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
AI, প্রযুক্তি ও নতুন অর্থনীতিতেও নেতৃত্বের চেষ্টা
BRICS-এর ভবিষ্যৎ শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না ভারত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টার্টআপ, উদ্ভাবন, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নমুখী AI ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের AI Impact Summit সফলভাবে আয়োজনের জন্য ভারতকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এটি ভবিষ্যতে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য AI-এর সুবিধা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই প্রযুক্তিগত বৈষম্য ও AI-এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণও বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে
BRICS সম্মেলনের সাফল্য সত্ত্বেও ভারতের সামনে বেশ কিছু কঠিন প্রশ্ন রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, ঘোষণাপত্রে ঐকমত্য তৈরি হলেও তার কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
BRICS-এর সদস্যদের জাতীয় স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী। ফলে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র তৈরি করা যতটা কঠিন, তার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর করা আরও কঠিন হতে পারে। কিছু বিশ্লেষণের মতে, New Delhi Declaration বিস্তৃত হলেও নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন-রোডম্যাপ এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
এছাড়া আগামী বছর BRICS-এর সভাপতিত্ব যাবে চীনের হাতে। ফলে ভারতের সভাপতিত্বে তৈরি হওয়া উদ্যোগগুলির কতটা ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সামনে ভারতের কূটনীতির নতুন পরীক্ষা
সব মিলিয়ে BRICS Summit 2026 ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ তৈরি করেছে। ভারত দেখাতে চেয়েছে যে রাশিয়া, চীন, ইরান, উপসাগরীয় দেশ এবং Global South-এর অন্যান্য শক্তির সঙ্গে একই টেবিলে বসে আলোচনা চালানোর সক্ষমতা তার রয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণ যত বাড়ছে, ততই এমন দেশগুলির গুরুত্ব বাড়ছে যারা একাধিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। ভারত সেই জায়গাটিই কাজে লাগাতে চাইছে।
BRICS সম্মেলনের পর ভারতের সামনে তাই মূল লক্ষ্য হতে পারে — Global South-এর স্বার্থ তুলে ধরা, রাষ্ট্রসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের পক্ষে সমর্থন বাড়ানো, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা।
অর্থাৎ, নয়াদিল্লির কূটনীতির মূল বার্তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে — ভারত কোনও একক শক্তিশিবিরের অংশ হয়ে নয়, বরং একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখেই বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বাড়াতে চায়।
BRICS সম্মেলন সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শন। এখন দেখার বিষয়, দিল্লিতে তৈরি হওয়া ঐকমত্য আগামী দিনে কতটা বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত হয় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত কতটা কার্যকর ‘সেতুবন্ধনকারী শক্তি’ হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

