পশ্চিমবঙ্গের মাটির নীচে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা নতুন করে সামনে এসেছে। অশোকনগরে ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে তেল উৎপাদন শুরু হয়েছে। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় বিরল খনিজ এবং ঝাড়গ্রামে ম্যাঙ্গানিজের সন্ধানে চলছে অনুসন্ধান। এসব সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য প্রমাণিত হলে শিল্প, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিবেশগত প্রভাব, প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা এবং অর্থনৈতিক লাভজনকতা যাচাই এখনও অত্যন্ত জরুরি।

পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের জন্য পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা রাজ্যের মাটির নীচে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে বাণিজ্যিকভাবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন শুরু হওয়ার পর এবার পুরুলিয়া-বাঁকুড়ায় বিরল খনিজ এবং ঝাড়গ্রামে ম্যাঙ্গানিজের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কাজ জোরদার হয়েছে। ফলে বাংলার খনিজ মানচিত্রে নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কোথাও খনিজের উপস্থিতি বা প্রাথমিক সম্পদের হিসাব পাওয়া এবং সেই খনিজকে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা — দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তাই এই মুহূর্তে “বাংলার মাটির নীচে বিপুল সম্পদ নিশ্চিত” বলার বদলে বলা যায়, রাজ্যের বেশ কয়েকটি এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
অশোকনগরে তেল উৎপাদন, বড় সাফল্য
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর। ONGC-এর অনুসন্ধানে সেখানে তেল ও গ্যাসের উপস্থিতি ধরা পড়ার পর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা, মূল্যায়ন এবং পরিকাঠামো তৈরির কাজ চলেছে। অবশেষে ২০২৬ সালে অশোকনগর তেলক্ষেত্রে বাণিজ্যিকভাবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন শুরু হয়েছে।
এর গুরুত্ব শুধু তেল উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গে তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ায় রাজ্যের জ্বালানি সম্পদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে এই সাফল্য রাজ্যের অন্যান্য সম্ভাবনাময় খনিজ অঞ্চলগুলিতে অনুসন্ধানের আগ্রহও বাড়াতে পারে।
পুরুলিয়ায় বিরল খনিজের সন্ধান
অশোকনগরের পর সবচেয়ে বেশি নজর এখন পুরুলিয়ার দিকে। Geological Survey of India বা GSI দীর্ঘদিন ধরে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার বিভিন্ন এলাকায় Rare Earth Elements বা REE এবং Rare Metals-এর অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় খনি মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় REE ও Rare Metals নিয়ে ১০টি অনুসন্ধান প্রকল্প চালানো হয়েছিল। ওই প্রকল্পগুলির মধ্যে পুরুলিয়ার চিরুগোড়া, মেদনিতার এবং পুরদাহা এলাকাকে অনুসন্ধানের G3 থেকে G2 পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গে আরও সাতটি REE ও Rare Metals-সংক্রান্ত অনুসন্ধান প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
পুরুলিয়ার কালাপাথর-রঘুডিহ এলাকাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেখানে প্রায় ৬.৭ লক্ষ টন Rare Earth Resources চিহ্নিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এই সংখ্যাকে সরাসরি “খনি থেকে উত্তোলনযোগ্য ৬.৭ লক্ষ টন খনিজ” হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সম্পদের হিসাব, গ্রেড, উত্তোলনের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক লাভজনকতা নির্ধারণের জন্য আরও কাজ প্রয়োজন।
কেন Rare Earth এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে Rare Earth Elements-এর গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, উইন্ড টারবাইন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্র তৈরিতে এই ধরনের খনিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
বিশ্বের Rare Earth supply chain-এ চিনের প্রভাব এখনও অত্যন্ত বেশি। ফলে ভারত নিজের দেশে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উৎস খুঁজে বের করা এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে Rare Earth-এর সম্ভাবনা কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে পুরুলিয়ায় অনুসন্ধান এখনও চলমান। এমনকি কালাপাথর-রঘুডিহ ব্লককে খনি সংক্রান্ত নিলামের জন্য এগিয়ে নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত দর না পাওয়ায় সেই নিলাম বাতিল হয়েছিল বলে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যেই উল্লেখ রয়েছে।
এবার নজর ঝাড়গ্রামের ম্যাঙ্গানিজে
এবার জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রামেও নতুন করে খনিজ অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে। রাজ্যের খনি ও খনিজ দফতর ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ম্যাঙ্গানিজ আকরিকের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে যৌথ সমীক্ষার অনুমোদন দিয়েছে।
শিমুলপাল, লাবনী, ভাণ্ডারচুয়া এবং চাউগা পাহাড়-সহ কয়েকটি এলাকায় এই অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে। MOIL-এর নেতৃত্বে GSI, Indian Bureau of Mines এবং West Bengal Mineral Development and Trading Corporation-এর প্রতিনিধিরা এই কাজে যুক্ত থাকবেন। মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা ১৫ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হওয়ার কথা।
এর ফলে ঝাড়গ্রামের মাটির নীচে ঠিক কতটা ম্যাঙ্গানিজ রয়েছে এবং তার গুণমান বা বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কতটা — সে বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
এই খনিজ সম্পদগুলি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য প্রমাণিত হলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। খনি শিল্পের সঙ্গে পরিবহণ, পরিকাঠামো, যন্ত্রপাতি, পরিষেবা এবং খনিজ-ভিত্তিক শিল্পেরও প্রসার ঘটতে পারে। স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বিশেষ করে Rare Earth-এর ক্ষেত্রে শুধু আকরিক উত্তোলন নয়, প্রক্রিয়াকরণ এবং value-added manufacturing গড়ে তুলতে পারলে রাজ্য আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
তবে এর পাশাপাশি পরিবেশ, জমি, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং বনাঞ্চলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষত জঙ্গলমহলের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় খনিজ উত্তোলনের আগে পরিবেশগত মূল্যায়ন ও স্থানীয় স্বার্থ রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখনই কি বলা যায় বাংলার ‘খনিজ বিপ্লব’ শুরু হয়ে গিয়েছে?
এখনই এমন দাবি করা কিছুটা বাড়াবাড়ি হবে। অশোকনগরে তেল উৎপাদন বাস্তব সাফল্য হলেও পুরুলিয়ার Rare Earth এবং ঝাড়গ্রামের ম্যাঙ্গানিজের ক্ষেত্রে এখনও অনুসন্ধান, সম্পদ মূল্যায়ন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের বিভিন্ন ধাপ বাকি।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গের খনিজ মানচিত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। অশোকনগরের তেল, পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার Rare Earth ও Rare Metals এবং ঝাড়গ্রামের ম্যাঙ্গানিজ — এই তিনটি ক্ষেত্র আগামী দিনে রাজ্যের অর্থনীতি ও শিল্পনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আগামী কয়েক বছরের অনুসন্ধান ও পরবর্তী সিদ্ধান্তই বলে দেবে, বাংলার মাটির নীচে থাকা এই সম্পদ কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

