দেশে বর্ষার বিদায় এখনও শুরু হয়নি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি পশ্চিম রাজস্থান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাহার শুরু হতে পারে। তবে গোটা দেশ থেকে একসঙ্গে বর্ষা বিদায় নেবে না। ধাপে ধাপে প্রত্যাহার চলবে। এদিকে বিভিন্ন রাজ্যে এখনও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বর্ষার শেষ পর্যায়ের বৃষ্টি কৃষি, জলসম্পদ ও খরিফ ফসলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে বর্ষার মরশুম শেষ হওয়ার প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। তবে আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি দেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাহার শুরু হওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম রাজস্থানের কিছু অংশ থেকে বর্ষা সরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এর অর্থ গোটা দেশ থেকে একসঙ্গে বর্ষা বিদায় নেওয়া নয়। বরং পশ্চিম রাজস্থান থেকে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বর্ষা সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ভারতে বর্ষার আগমন যেমন ধাপে ধাপে হয়, বিদায়ও একইভাবে পর্যায়ক্রমে ঘটে। সাধারণত জুনের শুরুতে কেরল উপকূল দিয়ে বর্ষার প্রবেশের পর তা দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্ষার প্রত্যাহারও শুরু হয় উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে এবং পরে ধীরে ধীরে মধ্য ও পশ্চিম ভারতের অন্যান্য অংশ এবং শেষপর্যন্ত দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকেও মৌসুমি বায়ু সরে যায়।
১৯ সেপ্টেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আবহাওয়া দফতরের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ১৯ সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি পশ্চিম রাজস্থানের আবহাওয়ায় এমন কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা বর্ষা প্রত্যাহারের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করবে। আকাশ পরিষ্কার হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, বাতাসের গতিপথ ও আর্দ্রতার পরিবর্তন — এই ধরনের একাধিক আবহাওয়াগত সূচক বিবেচনা করেই বর্ষা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে ১৯ সেপ্টেম্বরকে বর্ষা শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এই দিনটি বরং দেশের একটি অংশ থেকে বর্ষা প্রত্যাহারের সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে প্রত্যাহারের রেখা আরও দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে এগোতে পারে।
এখনও কেন বৃষ্টি হচ্ছে?
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও সক্রিয় রয়েছে একাধিক আবহাওয়া ব্যবস্থা। নিম্নচাপ, ঘূর্ণাবর্ত, মৌসুমি অক্ষরেখা এবং স্থানীয় বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে বর্ষার শেষ পর্যায়েও বিভিন্ন রাজ্যে বৃষ্টি হচ্ছে।
উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের কিছু অংশে আগামী কয়েকদিন বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও ধীরে ধীরে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে। অন্যদিকে দেশের পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং উপদ্বীপীয় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় আবহাওয়া ব্যবস্থার কারণে বর্ষার প্রভাব আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে।
ফলে কোনও একটি রাজ্যে বৃষ্টি কমে গেলেই সেই অঞ্চল থেকে বর্ষা সম্পূর্ণ বিদায় নিয়েছে, এমনটা বলা যায় না। বর্ষা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার সামগ্রিক পরিবর্তন এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
এ বছর বর্ষার ঘাটতি কতটা?
এবারের বর্ষায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের তারতম্য যথেষ্ট লক্ষণীয়। কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের কাছাকাছি বা তার বেশি বৃষ্টি হলেও বেশ কয়েকটি রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের জলসম্পদ, কৃষিকাজ এবং বিভিন্ন জলাধারের পরিস্থিতির ওপর বর্ষার এই ওঠানামার প্রভাব পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার শেষ কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টিও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খরিফ মরশুমের বিভিন্ন ফসল তখন বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে থাকে। ধান, ডাল, তৈলবীজ, তুলা-সহ বিভিন্ন ফসলের জন্য পর্যাপ্ত মাটির আর্দ্রতা প্রয়োজন। ফলে বর্ষা প্রত্যাহার দ্রুত হলে কোথাও কোথাও কৃষিকাজে তার প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
ভারতের কৃষি এখনও অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার শুরুতে ভালো বৃষ্টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই শেষ পর্যায়ের বৃষ্টিও বেশ কিছু ফসলের জন্য প্রয়োজনীয়।
যেসব এলাকায় ইতিমধ্যেই বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বর্ষা দ্রুত সরে গেলে মাটির আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পাকা বা কাটার অপেক্ষায় থাকা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে। তাই বর্ষার বিদায়ের সময় কৃষকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে কোথায় কতটা বৃষ্টি হচ্ছে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে খরিফ মরশুমের শেষ পর্যায়ের ফসলের অবস্থা।
বাংলায় কী হতে পারে?
পশ্চিম রাজস্থান থেকে বর্ষা প্রত্যাহার শুরু হলেও পশ্চিমবঙ্গে তার সরাসরি প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে পড়বে না। দেশের পূর্বাঞ্চলে বর্ষার প্রভাব আরও কিছুদিন থাকতে পারে। ফলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধেও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও পাদদেশীয় এলাকায় স্থানীয় আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বৃষ্টির প্রবণতা বজায় থাকতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে ভূমিধস ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধির মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। দক্ষিণবঙ্গে বর্ষার বিদায় যত এগিয়ে আসবে, ততই বৃষ্টির পরিমাণ ও স্থায়িত্বে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
বর্ষা বিদায়ের পর কী?
বর্ষা প্রত্যাহারের পর দেশের আবহাওয়ায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। আর্দ্রতা কমতে শুরু করে, অনেক অঞ্চলে পরিষ্কার আকাশের প্রবণতা বাড়ে এবং দিনের তাপমাত্রা ও রাতের তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্যও ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে।
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে বর্ষা বিদায়ের পর অপেক্ষাকৃত শুষ্ক আবহাওয়া দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। পরে দেশের অন্যান্য অংশেও মৌসুমি বায়ুর প্রভাব কমে আসবে। তবে দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই বর্ষা বিদায় মানেই দেশে বৃষ্টির সম্পূর্ণ অবসান নয়।
নজর এখন ১৯ সেপ্টেম্বরের দিকে
সব মিলিয়ে, ১৯ সেপ্টেম্বর দেশের আবহাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিম রাজস্থান থেকে বর্ষা প্রত্যাহারের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে ২০২৬ সালের বর্ষা বিদায়ের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে। তবে দেশের বাকি অংশে তার প্রভাব পড়তে আরও সময় লাগবে।
তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে কোন অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ কতটা কমছে, মৌসুমি অক্ষরেখার অবস্থান কীভাবে বদলাচ্ছে এবং বায়ুপ্রবাহের চরিত্র কী হচ্ছে — এসবের ওপরই নজর থাকবে আবহাওয়া দফতরের। কৃষি, জলসম্পদ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন — সব ক্ষেত্রেই বর্ষার এই শেষ পর্যায়ের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ, ১৯ সেপ্টেম্বরকে বর্ষার শেষ দিন নয়, বরং ভারতের মাটিতে বর্ষা বিদায়ের সম্ভাব্য সূচনাপর্ব হিসেবেই দেখা উচিত।

