যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর এখনও উত্তেজনা রয়েছে। ঘটনার তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি প্রণব চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে। কলকাতা পুলিশ CCTV ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ চেয়েছে। বৈঠকের পর উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। বহিরাগতদের প্রবেশ, নিরাপত্তা এবং সংঘর্ষের কারণ নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এখনও কাটেনি উত্তেজনা। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, বহিরাগতদের প্রবেশ, ভাঙচুর এবং সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ নিয়ে চলছে একাধিক স্তরে তদন্ত। এরই মধ্যে তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন, পুলিশের CCTV ফুটেজ চাওয়া এবং উপাচার্যের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
গত ১৯ ও ২০ আগস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দুই পক্ষের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। সংঘর্ষে কয়েকজন ছাত্র আহত হন বলে জানা যায়। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগও ওঠে। উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসার অভিযোগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয় তীব্র চাপানউতোর।
তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান বদল
ঘটনার তদন্তের জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি তৈরি করেছিল। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ শুভ শঙ্কর সরকারকে ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছিল। তবে তিনি পরে এই দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। কার্যকরভাবে তদন্ত পরিচালনা করতে তাঁর অসুবিধা রয়েছে বলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানান। তাঁর নিয়োগ নিয়েও একটি শিক্ষক সংগঠনের আপত্তি উঠেছিল।
এরপর সোমবারের সর্বদলীয় বা সকল পক্ষের প্রতিনিধিদের বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, তদন্ত কমিটির নতুন প্রধান হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি প্রণব চট্টোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাঁচ সদস্যের কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক হিংসা ও ভাঙচুরের ঘটনা খতিয়ে দেখবে। জানা গিয়েছে, কমিটির প্রথম বৈঠক ২৭ আগস্ট হওয়ার কথা।
তদন্তের ক্ষেত্রে CCTV ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ঘটনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের কেউ যুক্ত ছিলেন কি না, বহিরাগতরা কীভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকল এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোথায় গাফিলতি ছিল — এই প্রশ্নগুলিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
CCTV ফুটেজ চাইল কলকাতা পুলিশ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অশান্তির তদন্তে এবার সরাসরি CCTV ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ চেয়েছে কলকাতা পুলিশ। সোমবার পুলিশের একটি দল সাদা পোশাকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় এবং প্রশাসনের কাছে নোটিস দেয়। ওই নোটিসে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের সঙ্গে সম্পর্কিত CCTV ফুটেজ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য পুলিশের হাতে তুলে দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ এবং CCTV ফুটেজ তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়া হবে। উপাচার্যও জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তে সহযোগিতা করবে। ২০ আগস্টের ঘটনায় পুলিশের কাছে একাধিক FIR দায়ের হয়েছে এবং তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বৈঠকের পর অসুস্থ উপাচার্য
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। বৈঠকে নিরাপত্তা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক চলাকালীন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য অসুস্থ বোধ করেন। পরে বাইরে বেরোনোর সময় তিনি পড়ে যান এবং তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত কাজের চাপ ও ক্লান্তির কারণেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আধিকারিক জানিয়েছেন।
তবে এই ঘটনা নিয়েও ক্যাম্পাসে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছাত্রদের একাংশ উপাচার্যের অসুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রত্যক্ষ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য আলাদা হওয়ায় ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
বহিরাগত প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন
যাদবপুরের সাম্প্রতিক অশান্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে বহিরাগতদের প্রবেশ। বিভিন্ন CCTV ফুটেজ এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা দাবি সামনে এসেছে। ছাত্র ও শিক্ষক মহলের একাংশের অভিযোগ, বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিরা কীভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেন এবং তাঁদের প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, কয়েকটি সংগঠন CCTV ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, পুলিশকে দেওয়ার আগেই ফুটেজ কীভাবে বাইরে এল, সেটিও তদন্ত করা দরকার। ফলে মূল সংঘর্ষের পাশাপাশি CCTV ফুটেজের উৎস এবং তার প্রচার নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে। নিরাপত্তারক্ষীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, নজরদারি বাড়ানো এবং নিরাপত্তাকর্মীদের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর লক্ষ্য ভবিষ্যতে কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এদিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল তদন্তকে নিরপেক্ষ রাখা এবং একই সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক করা।
এখন নজর তদন্তের দিকে
এই মুহূর্তে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রিত হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। তদন্ত কমিটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে প্রাক্তন বিচারপতির নিয়োগ এবং পুলিশের হাতে CCTV ও অন্যান্য প্রমাণ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া আগামী কয়েক দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তদন্ত, কলকাতা পুলিশের তদন্ত এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য—এই তিনটি প্রক্রিয়া থেকে শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, বহিরাগতদের ভূমিকা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতি সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনকে ঘটনার জন্য দায়ী বলে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা সমীচীন নয়। বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা।

