সিরিয়াকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে ইসরায়েল সিরিয়ার একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। আঙ্কারা এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। গাজা ইস্যু এবং নেতানিয়াহুকে ঘিরে তুরস্কের আইনি উদ্যোগেও দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। তবে এখনও সরাসরি ইসরায়েল-তুরস্ক যুদ্ধ শুরু হয়নি। সিরিয়াই সংঘাতের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। আগামী দিনে কূটনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে নজর কেড়েছে ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি। দুই দেশের মধ্যে এখনও সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়নি, কিন্তু সিরিয়াকে কেন্দ্র করে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলা, সিরিয়ায় তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তি এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তুরস্কের আইনি পদক্ষেপ — সব মিলিয়ে আঙ্কারা ও জেরুজালেমের সম্পর্ক আরও তলানিতে পৌঁছেছে।
সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলা
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটি। ১৭-১৮ আগস্ট রাতে ইসরায়েল ওই ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানঘাঁটির রানওয়ে ও অন্যান্য স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি আরও দক্ষিণে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের আশঙ্কা ছিল, ওই বিমানঘাঁটি তুরস্কের সামরিক অবকাঠামো তৈরির কাজে ব্যবহার হতে পারে। ইসরায়েল মনে করে, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়লে তার উত্তর সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভাব্য তুর্কি সামরিক সম্প্রসারণ ঠেকাতেই বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে বলে ইসরায়েলি পক্ষের বক্তব্য।
তুরস্কের অবস্থান কী?
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপে তুরস্ক তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আঙ্কারা সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক হামলার সমালোচনা করেছে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা-যুক্তিকে হামলার বৈধতা দেওয়ার অজুহাত হিসেবে দেখেছে।
তবে সিরিয়ার পক্ষ থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জানিয়েছেন, আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে স্থায়ী তুর্কি সামরিক ঘাঁটি তৈরির কোনও পরিকল্পনা ছিল না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিয়া ইসরায়েলকে আগেই জানিয়েছিল যে বিমানঘাঁটিটি সিরিয়ার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তারপরও ইসরায়েল হামলা চালায়।
এই অবস্থান ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনাকে আরও জটিল করেছে। কারণ, একদিকে তুরস্ক সিরিয়ার নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে সেখানে প্রভাব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েল সিরিয়ায় নিজের নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
কেন সিরিয়া এত গুরুত্বপূর্ণ?
সিরিয়া এখন মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন পরিস্থিতিতে তুরস্ক সিরিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। অন্যদিকে ইসরায়েল সিরিয়ার ভূখণ্ডে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এই কারণেই সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি ইসরায়েলের কাছে কৌশলগত উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল ও তুরস্ক — দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও সিরিয়াকে নিয়ে তাদের স্বার্থ এখন অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী।
গাজা ইস্যুতেও মুখোমুখি দুই দেশ
ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু সিরিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। গাজা যুদ্ধ নিয়েও দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও মানবিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে আসছে। অন্যদিকে ইসরায়েল তুরস্কের অবস্থান এবং হামাসের সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
এই রাজনৈতিক বিরোধ সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়েছে। ২১ আগস্ট তুরস্কের বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেক ঘোষণা করেন, গাজামুখী Global Sumud Flotilla-কে ঘিরে একটি মামলায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের Red Notice চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইসরায়েল এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংঘাতও আরও গভীর হয়েছে।
সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা কতটা?
বর্তমানে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে সরাসরি সামরিক যুদ্ধ চলছে — এমন কোনও তথ্য নেই। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষের ঘটনাও মূলত সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলাকে কেন্দ্র করে। তবে পরিস্থিতির ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হল, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা অভিযান যদি একই এলাকায় ক্রমশ কাছাকাছি চলে আসে, তাহলে কোনও ভুল বোঝাবুঝি বা সামরিক ঘটনার কারণে দুই দেশের বাহিনী মুখোমুখি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সিরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিও পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে সিরিয়ার বর্তমান উত্তেজনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা
তবে সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টাও চলছে। ২৪ আগস্ট সিরিয়া ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা মার্কিন মধ্যস্থতায় জর্ডানে বৈঠকে বসেন। আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল সিরিয়ায় সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার পর পরিস্থিতি শান্ত করা এবং ইসরায়েল-তুরস্ক উত্তেজনা যেন আরও বড় আঞ্চলিক সংকটে পরিণত না হয় তা নিশ্চিত করা। এই আলোচনার ফলাফল এখনই বড় কোনও সমাধান এনে দিয়েছে বলা না গেলেও, কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু থাকা পরিস্থিতির ইতিবাচক দিক।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল — সিরিয়ায় তুরস্ক কতটা সামরিক ভূমিকা বাড়াবে এবং ইসরায়েল সেই উপস্থিতিকে কীভাবে দেখবে। তুরস্ক যদি সিরিয়ার নতুন সরকারের নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামো তৈরিতে আরও সক্রিয় হয়, তাহলে ইসরায়েলের সঙ্গে তার কৌশলগত সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েল যদি সিরিয়ার ভূখণ্ডে তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আরও অভিযান চালায়, তাহলে আঙ্কারার প্রতিক্রিয়াও কঠোর হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল — ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়নি। বরং সিরিয়াকে কেন্দ্র করে দুই আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থের সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে গাজা ইস্যু এবং নেতানিয়াহুকে ঘিরে তুরস্কের আইনি পদক্ষেপ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে তাই সিরিয়া এখন শুধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নয়; বরং ইসরায়েল ও তুরস্কের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতারও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক ভূমিকা এবং ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াই পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তার বড় নির্ধারক হতে পারে।

