ভারত-চিন সীমান্তে ফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, বেজিংয়ে অজিত ডোভাল-ওয়াং ই

- Advertisement -

বেজিংয়ে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভারত-চিন সীমান্ত বিষয়ক ২৫তম Special Representatives বৈঠক। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ও চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই সীমান্তে শান্তি, LAC-এ স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করবেন। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন BRICS Summit এবং সম্ভাব্য শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের প্রেক্ষাপটেও বৈঠকটির গুরুত্ব রয়েছে।

ভারত-চিন সীমান্তে ফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, বেজিংয়ে অজিত ডোভাল-ওয়াং ই
India-China high-level talks amid renewed border discussions.

ভারত ও চিনের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে আজ বেজিংয়ে বসছে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী তথা সীমান্ত বিষয়ক Special Representative ওয়াং ই-র নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হবে ভারত-চিন Special Representatives-এর ২৫তম দফার আলোচনা। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC-কে ঘিরে মতপার্থক্য কমানো এবং দুই দেশের সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করার পথ খোঁজাই এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।

অজিত ডোভাল ইতিমধ্যেই দু’দিনের সফরে বেজিং পৌঁছেছেন। চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, দুই দেশের Special Representatives সীমান্ত প্রশ্নের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও গভীরভাবে আলোচনা করবেন। চিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতেই ২৫তম দফার বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে।

সীমান্ত প্রশ্নই বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দু

ভারত ও চিনের মধ্যে প্রায় ৩,৪০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ বিতর্কিত সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সীমান্তের বিভিন্ন অংশে দুই দেশের দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম সেক্টরের লাদাখ এবং পূর্ব সেক্টরের অরুণাচল প্রদেশকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে Special Representatives-এর আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ। ২০০৩ সালে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, যাতে দুই দেশ রাজনৈতিক স্তরে সীমান্ত বিরোধের একটি সামগ্রিক সমাধানের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে পারে। অজিত ডোভাল ভারতের Special Representative এবং ওয়াং ই চিনের Special Representative হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

তবে আজকের বৈঠক থেকেই দীর্ঘদিনের সীমান্ত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হয়ে যাবে — এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতে নতুন করে সংঘর্ষ বা উত্তেজনা যাতে তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও শক্তিশালী করা।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর সম্পর্কের পরিবর্তন

২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ ভারত-চিন সম্পর্ককে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছিল। পূর্ব লাদাখে দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। দুই দেশের সেনাবাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন রাখে।

এর পর একাধিক দফায় সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর Special Representatives-এর বৈঠক ফের শুরু হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। সেই সময় অজিত ডোভাল বেজিংয়ে গিয়ে ওয়াং ই-র সঙ্গে সীমান্ত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এরপর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

বর্তমান বৈঠক সেই ধারাবাহিকতারই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সীমান্তে উত্তেজনা কমলেও ভারত ও চিনের মধ্যে আস্থার ঘাটতি পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।

LAC-এ স্থিতিশীলতা ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ

ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। সম্প্রতি বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে চিনের সঙ্গে সুস্থ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ফলে আজকের আলোচনায় LAC-এ ভবিষ্যতে কোনও ধরনের নতুন উত্তেজনা এড়ানোর ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অরুণাচল প্রদেশও বড় বিষয়

ভারত-চিন সীমান্ত প্রশ্নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ অরুণাচল প্রদেশ। এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে চিন নিজেদের দাবি করে থাকে। ভারত অবশ্য চিনের এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে জানিয়ে এসেছে।

অতীতে অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন এলাকার নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে বেজিং। নয়াদিল্লি সেই ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। ফলে সীমান্ত বিরোধের রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনায় পূর্ব সেক্টরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বৈঠকের সঙ্গে BRICS Summit-এর যোগসূত্র

এবারের আলোচনার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে BRICS Summit অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যোগ দিতে পারেন বলে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। রয়টার্স-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও সফরটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

সেক্ষেত্রে অজিত ডোভালের বেজিং সফরকে সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের ভারত-চিন যোগাযোগের আগে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সীমান্ত প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক যোগাযোগের পরিবেশও আরও ইতিবাচক হতে পারে।

ডোভালের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ

বেজিং সফরের সময় অজিত ডোভালের চিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। ফলে তাঁর সফর শুধুমাত্র সীমান্ত আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ২০২০ সালের পর ভারত-চিন সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কী ফলাফল আসতে পারে?

আজকের বৈঠক থেকে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হল সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আরও স্পষ্ট বোঝাপড়া তৈরি হওয়া। দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত সমাধানের পথে রাজনৈতিক স্তরে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এই বৈঠকেই LAC-এর সম্পূর্ণ নির্ধারণ বা সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যাবে — এমন সম্ভাবনা কম। কারণ ভারত-চিন সীমান্ত সমস্যা বহু দশকের পুরনো এবং এর সঙ্গে দুই দেশের ভৌগোলিক দাবি, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বার্থ জড়িত।

তাই আজকের আলোচনার প্রকৃত গুরুত্ব বিচার করতে হবে বৈঠক শেষে দুই দেশের সরকারি বিবৃতি থেকে। বিশেষ করে LAC-এ শান্তি, সীমান্তে উত্তেজনা এড়ানো, সামরিক যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার রূপরেখা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত বা বার্তা দেওয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।

সব মিলিয়ে, অজিত ডোভাল ও ওয়াং ই-র ২৫তম Special Representatives বৈঠক ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ। গালওয়ান-পরবর্তী দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর দুই দেশ সম্পর্ককে কতটা স্থিতিশীল পথে নিয়ে যেতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলতে পারে এই বৈঠক থেকেই।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -