শিল্প-বিনিয়োগে বাংলার ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ, আস্থা ফেরাতেই বড় বিনিয়োগের অপেক্ষা

- Advertisement -

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে রাজ্য সরকার। তবে অতীতের নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি বাংলার শিল্পভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বড় কর্পোরেট বিনিয়োগ, নতুন শিল্পনীতি, জমি সংস্কার, আর্থিক প্রণোদনা এবং MSME-কে সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা চলছে। এখন মূল লক্ষ্য, ঘোষণাকে বাস্তব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা।

শিল্প-বিনিয়োগে বাংলার ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ, আস্থা ফেরাতেই বড় বিনিয়োগের অপেক্ষা
West Bengal aims to boost industrial investment and restore investor confidence through new policies and major investment initiatives.

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন করে উদ্যোগ শুরু করেছে রাজ্য সরকার। কিন্তু শুধু নতুন শিল্পনীতি, আর্থিক প্রণোদনা বা পরিকাঠামো উন্নয়ন নয় — বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাকে ঘিরে যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটানোই এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সম্প্রতি শিল্প-বাণিজ্য মহলের এক আলোচনায় তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বাংলার শিল্পক্ষেত্রের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস ফেরানো জরুরি।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে কিছু ক্ষেত্রে ঘোষিত শিল্প-প্রণোদনা পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন বা প্রত্যাহার, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা এবং দীর্ঘদিনের নানা অনিশ্চয়তা রাজ্যের শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করতে শুধু সুযোগ-সুবিধার কথা বললেই হবে না, সরকারের নীতি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী এবং পূর্বানুমানযোগ্য — এই বিশ্বাসও তৈরি করতে হবে।

বড় বিনিয়োগকে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে দেখছে সরকার

বাংলার শিল্পক্ষেত্রে অন্তত একটি বড় কর্পোরেট বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার। স্বপন দাশগুপ্তের মতে, কোনও বড় সংস্থা যদি পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে এবং প্রকল্প সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে তার প্রভাব শুধু ওই একটি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অন্য দেশি-বিদেশি সংস্থার কাছেও তা ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।

অর্থাৎ, একটি বড় প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আরও বিনিয়োগের দরজা খুলে যেতে পারে। সেই কারণেই বড় শিল্পগোষ্ঠীর আস্থা অর্জনকে শিল্প পুনরুজ্জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জমি নীতিতে বদলের প্রস্তুতি

বিনিয়োগ টানতে জমি সংক্রান্ত জটিলতা দূর করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা অচল হয়ে থাকা শিল্পাঞ্চলের জমি নতুন শিল্পের কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। শিল্পের জন্য নির্ধারিত জমি যাতে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত না থাকে কিংবা শুধুমাত্র আবাসন বা বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও নতুন নীতির কথা বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের জন্য জমির প্রশ্নটি বরাবরই সংবেদনশীল। ফলে নতুন নীতি কার্যকর করতে গেলে জমির মালিকানা, আইনি জটিলতা, পুনর্বাসন এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ — সব দিককেই গুরুত্ব দিতে হবে। দ্রুত জমি পাওয়া এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীর কাছে আইনি নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হলে শিল্প স্থাপনের গতি বাড়তে পারে।

নতুন শিল্পনীতিতে ইনসেন্টিভে জোর

রাজ্যের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে শিল্প ও বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে এবং নতুন ইনসেন্টিভ নীতি আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। বড় শিল্পের পাশাপাশি MSME এবং স্টার্টআপ ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নতুন শিল্পনীতিতে আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি শিল্প পার্ক, লজিস্টিক পরিকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন এবং নির্দিষ্ট শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু জমি বা করছাড়ের সুবিধা নয়, উৎপাদন থেকে পণ্য পরিবহণ পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক পরিকাঠামো তৈরি করা।

শুধু বড় শিল্প নয়, MSME-তেও নজর

শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বড় কর্পোরেট সংস্থার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে। কারণ বড় শিল্পের সঙ্গে বহু ছোট ও মাঝারি সংস্থা সরবরাহকারী, পরিষেবা প্রদানকারী এবং ancillary unit হিসেবে যুক্ত থাকে। ফলে বড় বিনিয়োগ এলে স্থানীয় MSME ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বাড়তে পারে।

রাজ্যের বাজেটে মাইক্রো উদ্যোক্তাদের জন্য ‘বাংলার উদ্যোগ ক্রেডিট কার্ড’-এর মাধ্যমে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন স্টার্টআপ নীতি, ইনকিউবেশন ফান্ড এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাস্তবায়নেই

তবে শিল্পমহলের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল — ঘোষিত নীতিগুলি কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেন। তাই নীতি বদলের সম্ভাবনা, জমি পাওয়া, অনুমোদন, বিদ্যুৎ ও পরিকাঠামো, শ্রম সংক্রান্ত বিষয় এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পূর্বানুমানযোগ্যতা তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গকে অন্য শিল্পোন্নত রাজ্যগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে ‘Ease of Doing Business’-এর বাস্তব প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। শুধু বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, ঘোষিত প্রকল্প বাস্তবে কত দ্রুত কাজ শুরু করছে এবং কত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে — তার ওপরই শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ আনতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা বদলে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্থায়ী আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের বক্তব্যেও সেই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, একটি উল্লেখযোগ্য কর্পোরেট বিনিয়োগ বাংলার শিল্পক্ষেত্রে আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

ফলে আগামী দিনে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি, জমি নীতি, আর্থিক প্রণোদনা এবং বড় শিল্প প্রকল্পের অগ্রগতি — সবকিছুর দিকেই নজর থাকবে। শেষ পর্যন্ত বাংলার শিল্পের ভাবমূর্তি কতটা বদলাবে, তার উত্তর মিলবে ঘোষণায় নয়, বাস্তবে কতগুলি নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে, কত বিনিয়োগ আসছে এবং কত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে — তার মধ্যেই।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -