প্যাকেটজাত খাবারে লাল সতর্কতা? চিনি-লবণ-ফ্যাট নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের পথে ভারত

- Advertisement -

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারে স্বাস্থ্য সতর্কতামূলক লেবেল চালুর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলে প্যাকেটের সামনের দিকে স্পষ্ট সতর্কতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এ নিয়ে FSSAI-এর কাছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে। শিশুদের স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে আরও কঠোর খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে দেশে।

প্যাকেটজাত খাবারে লাল সতর্কতা? চিনি-লবণ-ফ্যাট নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের পথে ভারত
India considers front-of-pack warning labels for foods high in sugar, salt and saturated fat.

প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে এবার আরও স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কতা দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে — এমন খাবারের প্যাকেটের সামনের দিকে সতর্কতামূলক লেবেল বসানোর প্রস্তাব নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে দেশে। বিষয়টি এখন পৌঁছেছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, বিশেষ করে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর লেবেলিং ব্যবস্থা প্রয়োজন কি না, তা খতিয়ে দেখছে শীর্ষ আদালত।

সম্প্রতি এক শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, বিষয়টি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক বা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আদালতের বেঞ্চে বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রন ছিলেন। আদালত বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।

কী ধরনের সতর্কতা হতে পারে?

Food Safety and Standards Authority of India বা FSSAI প্যাকেটের সামনের দিকে দৃশ্যমান সতর্কতামূলক চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে। আলোচনায় থাকা নকশার মধ্যে রয়েছে লাল রঙের হেক্সাগন আকৃতির সতর্কতা চিহ্ন। কোনও প্যাকেটজাত খাবারে নির্ধারিত সীমার তুলনায় বেশি চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলে ক্রেতাকে প্যাকেটের সামনেই তা জানানোর লক্ষ্য এই ব্যবস্থার।

বর্তমানে অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগুণ সংক্রান্ত তথ্য প্যাকেটের পিছনে বা তুলনামূলক ছোট আকারে দেওয়া থাকে। ফলে দ্রুত কেনাকাটার সময় অনেক ক্রেতার পক্ষে সেই তথ্য পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়। সামনের দিকে বড় ও সহজে বোঝা যায় এমন সতর্কতা থাকলে ক্রেতারা খাবার কেনার আগে ঝুঁকির বিষয়টি দ্রুত বুঝতে পারবেন — এটাই প্রস্তাবের অন্যতম উদ্দেশ্য।

‘দুই উপাদান’ থেকে ‘এক উপাদান’-এ বদল?

এই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল সতর্কতার জন্য কতগুলি পুষ্টি উপাদান নির্ধারিত সীমার বেশি থাকা প্রয়োজন।

FSSAI-এর আগের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, কোনও প্যাকেটজাত খাবারে নির্ধারিত মাত্রার বেশি দুটি বা তার বেশি উদ্বেগজনক উপাদান — যেমন চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলে সতর্কতামূলক লেবেল লাগানো হবে। কিন্তু এই পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি ওঠে। কারণ কোনও খাবারে শুধু চিনি অত্যন্ত বেশি থাকলেও, অন্য দুটি উপাদান সীমার মধ্যে থাকলে সেই পণ্যে সতর্কতা নাও আসতে পারে।

এই যুক্তি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন ওঠার পর FSSAI অবস্থান কিছুটা বদলানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। সাম্প্রতিক শুনানিতে খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, চিনি, লবণ বা ফ্যাট — এই তিনটির মধ্যে যে কোনও একটি নির্ধারিত মাত্রার বেশি থাকলেও সতর্কতামূলক লেবেল দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত আগের তুলনায় আরও কঠোর ব্যবস্থা চালু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কতটা চিনি বা লবণ হলে ‘বেশি’?

তবে এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কোনও খাবারে কত পরিমাণ চিনি, লবণ বা ফ্যাট থাকলে সেটিকে ‘উচ্চ মাত্রার’ বলে সতর্কতামূলক লেবেল দিতে হবে — তার নির্দিষ্ট সীমা এবং সেই সীমা নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট FSSAI-এর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।

আদালত জানতে চেয়েছে, প্রস্তাবিত সীমাগুলি কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা পুষ্টিবিষয়ক মানদণ্ডের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। সতর্কতার নকশা, বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং কত দ্রুত এই ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব, সেসব বিষয়ও আদালতের নজরে রয়েছে।

শিল্পমহলের আপত্তি কোথায়?

অন্যদিকে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের একাংশ প্রস্তাবিত ব্যবস্থার কিছু দিক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। শিল্প সংগঠনগুলির বক্তব্য, পুষ্টির হিসাব শুধুমাত্র প্রতি ১০০ গ্রাম বা ১০০ মিলিলিটার পণ্যের ভিত্তিতে করলে বাস্তবে একজন মানুষ কতটা খাবার গ্রহণ করছেন, তা সবসময় সঠিকভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

এই কারণে শিল্পমহলের একটি অংশ per-serving, অর্থাৎ একজন ভোক্তার সাধারণত খাওয়ার পরিমাণের ভিত্তিতে পুষ্টির হিসাব করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। এ বিষয়ে All-India Food Processors’ Association-সহ শিল্প প্রতিনিধিরা সুপ্রিম কোর্টে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছে।

কেন শিশুদের নিয়ে এত উদ্বেগ?

বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় উদ্বেগ হল শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ চিনি, লবণ এবং ফ্যাটযুক্ত খাবারের জনপ্রিয়তা। প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, মিষ্টি পানীয়, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, বিস্কুটসহ নানা ধরনের খাবার শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে উঠছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের প্যাকেটের সামনে সহজে বোঝা যায় এমন সতর্কতা থাকলে বাবা-মা এবং অন্যান্য ক্রেতা তুলনামূলকভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে শুধু লেবেল লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে না — খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতা, স্কুল পর্যায়ে পুষ্টিশিক্ষা এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও কার্যকর নীতি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এখন কী হতে চলেছে?

এই মুহূর্তে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত আইন বা বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত হয়নি। FSSAI-এর প্রস্তাব, কেন্দ্রের অবস্থান, শিল্পমহলের আপত্তি এবং জনস্বাস্থ্যের যুক্তি — সব দিক বিবেচনা করছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশ বা পর্যবেক্ষণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে এবং মামলাটি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ফের শুনানির জন্য রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, এখনই বাজারের প্রতিটি প্যাকেটজাত খাবারে লাল হেক্সাগন সতর্কতা দেখা শুরু হচ্ছে না। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট, ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলিং ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোনও খাবারে শুধু একটি উপাদান — চিনি, লবণ বা ফ্যাট অতিরিক্ত থাকলেও সতর্কতা দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে খাদ্য প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির ওপর নতুন নিয়ম মেনে চলার চাপ বাড়বে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভবিষ্যতে বাজারে কোনও প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় ক্রেতাকে শুধু বিজ্ঞাপনের দাবি বা প্যাকেটের আকর্ষণীয় ডিজাইনের ওপর নির্ভর না করে সামনের সতর্কতামূলক তথ্য দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। জনস্বাস্থ্য বনাম খাদ্যশিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থ — এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই শেষ পর্যন্ত ভারতের নতুন খাদ্য লেবেলিং নীতি তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -