বাম-তৃণমূলের শিক্ষানীতিকে কাঠগড়ায় শুভেন্দু, সামনে এল একাধিক অভিযোগ

- Advertisement -

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাম ও তৃণমূল আমলের শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম, বাংলা ভাষা ও ইতিহাস পড়ানোর ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, জাতীয় শিক্ষানীতি, বিদ্যাভারতীর বিদ্যামন্দিরের প্রসার এবং স্কুলে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন চাপানউতোর।

বাম-তৃণমূলের শিক্ষানীতিকে কাঠগড়ায় শুভেন্দু, সামনে এল একাধিক অভিযোগ

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার কলকাতার গোলপার্কে রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগের বামফ্রন্ট ও তৃণমূল সরকারের আমলের শিক্ষানীতি এবং পাঠ্যক্রম নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের নানা সিদ্ধান্তের ফলে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে এবং এখন তা সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

অনুষ্ঠানটি ছিল বিবেকানন্দ বিদ্যা ভারতী বিকাশ পরিষদের বার্ষিক কর্মসূচি। সংগঠনটি বিদ্যাভারতীর সঙ্গে যুক্ত। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জাতীয়তাবোধ এবং দেশপ্রেমকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি।

বাম আমলের শিক্ষানীতি নিয়ে প্রশ্ন

শুভেন্দুর অভিযোগ, বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘ শাসনকালে বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে বাধা তৈরি হয়েছিল। তাঁর দাবি, বাংলা ও ইংরেজি — দুই ভাষার শিক্ষার ক্ষেত্রেই সেই সময় একাধিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করা হয়েছিল। পরে তৃণমূল সরকারের আমলেও শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এই অভিযোগগুলি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন নিয়ে রাজ্যে এর আগেও বাম ও তৃণমূল—দুই শিবিরের বিরুদ্ধেই রাজনৈতিক অভিযোগ উঠেছে। শুভেন্দুর বক্তব্য সেই পুরনো বিতর্ককেই নতুন করে সামনে আনল।

বাংলা ভাষার পাঠ্যক্রম নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ

তৃণমূল সরকারের আমলের স্কুলের পাঠ্যক্রম নিয়ে আরও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, বাংলা ভাষার স্বাভাবিক শব্দের পরিবর্তে অন্য ভাষা থেকে আসা কিছু শব্দ পাঠ্যক্রমে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ফলে বাংলা ভাষার নিজস্বতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘মা’, ‘জল’ এবং ‘আকাশ’-এর মতো পরিচিত বাংলা শব্দের পরিবর্তে ‘আম্মা’, ‘পানি’ ও ‘আসমান’-এর মতো শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তাঁর দাবি, এই ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে বিভাজনের মানসিকতা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল।

এই অভিযোগের পাশাপাশি তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও স্বামী বিবেকানন্দের মতো বাংলার বিশিষ্ট মনীষীদের চিন্তা ও অবদানের যথাযথ গুরুত্ব শিক্ষাব্যবস্থায় থাকা উচিত বলেও মত প্রকাশ করেন।

ইতিহাসের পাঠ্যক্রম নিয়েও আপত্তি

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রসঙ্গে ইতিহাসের পাঠ্যক্রমের কথাও উঠে আসে। শুভেন্দুর অভিযোগ, পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের সিলেবাসে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিপ্লবীদের অবদান যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

বিশেষ করে ক্ষুদিরাম বসু ও মাতঙ্গিনী হাজরার মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলার ইতিহাস ও স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলিকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও আক্রমণ

শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, এর ফলে শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশার মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ইতিমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের অন্যতম বিষয়। সেই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রীর এ দিনের মন্তব্য নতুন করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ও নতুন দিশার দাবি

শুভেন্দু অধিকারী জানান, তাঁর সরকার রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষার সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতীয় চেতনার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

এদিনের অনুষ্ঠানে বিদ্যাভারতীর প্রতিনিধিরাও মূল্যভিত্তিক শিক্ষা এবং জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গর্ব তৈরি করা তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

এক বছরে ১ হাজার বিদ্যামন্দিরের লক্ষ্য

অনুষ্ঠান থেকেই রাজ্যে বিদ্যাভারতীর বিদ্যামন্দিরের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে একটি বড় লক্ষ্যের কথা সামনে আসে। আগামী এক বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যাভারতীর বিদ্যামন্দিরের সংখ্যা ১ হাজারে পৌঁছনোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এই ঘোষণাকে ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের প্রশ্ন, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের শিক্ষা পরিকাঠামোর প্রসারকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে সমর্থকদের বক্তব্য, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও জাতীয় চেতনা গড়ে তুলতে এই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

‘বন্দে মাতরম’ নিয়েও কড়া বার্তা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া নিয়েও এদিন স্পষ্ট বার্তা দেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, স্কুলের প্রার্থনায় ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ সংস্করণ গাওয়ার নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তা না হলে সরকারি আর্থিক সাহায্য ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

ফলে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এ দিনের বক্তব্য শুধুমাত্র পাঠ্যক্রম বা শিক্ষক নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয়তাবোধ, ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় প্রতীকের ব্যবহার — সবকিছুকেই শিক্ষার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

সামনে আরও বাড়তে পারে রাজনৈতিক চাপানউতোর

শুভেন্দুর এ দিনের বক্তব্যের পর পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে সরকার শিক্ষায় সংস্কার, জাতীয় শিক্ষানীতি এবং ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে। অন্যদিকে বিরোধীদের পক্ষ থেকে এই নীতির উদ্দেশ্য, পাঠ্যক্রমে পরিবর্তনের ধরন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা এখন শুধুমাত্র পড়াশোনা ও পরিকাঠামোর বিষয় নয় — ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবোধ এবং রাজনৈতিক দর্শনের প্রশ্নও ক্রমশ এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য সেই বিতর্ককেই আরও সামনে নিয়ে এল।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -