আরও ভয়ঙ্কর El Niño-র আশঙ্কা, বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি

- Advertisement -

২০২৬ সালের শেষভাগে শক্তিশালী El Niño পরিস্থিতির আশঙ্কা বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা, খরা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়তে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে দুর্বল বর্ষা, কৃষিতে ক্ষতি, জলসম্পদের চাপ এবং খাদ্যদ্রব্যের দামে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত এর প্রভাব থাকার সম্ভাবনাও নজরে রাখা হচ্ছে।

আরও ভয়ঙ্কর El Niño-র আশঙ্কা, বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি

প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষভাগে El Niño পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। এমনকি চলতি El Niño রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলির একটি হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খরা ও অতিবৃষ্টির ধরনেও বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

WMO-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এই উষ্ণতা শক্তিশালী El Niño পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এবং পরবর্তী কয়েক মাসে শক্তিশালী El Niño পরিস্থিতির সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

কী এই El Niño?

El Niño আসলে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অংশে সমুদ্রের উপরিভাগের অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। সমুদ্রের এই পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের গতিপ্রকৃতিও বদলে যায়। তার প্রভাব পড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশগুলির আবহাওয়ার ওপর।

কখনও এর কারণে কোনও অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হয়, আবার অন্য অঞ্চলে দেখা দেয় বৃষ্টির ঘাটতি। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা তৈরি হতে পারে, আবার কোথাও অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে বন্যা বা ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

এই কারণেই শক্তিশালী El Niño-কে শুধুমাত্র ‘গরম সমুদ্র’ হিসেবে দেখছেন না আবহাওয়াবিদরা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ বদলে যাওয়ার আশঙ্কা।

রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা কতটা?

যুক্তরাষ্ট্রের NOAA-র পূর্বাভাসে সেপ্টেম্বর-নভেম্বর থেকে নভেম্বর-জানুয়ারি সময়কালে ‘very strong El Niño’ হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে ১৯৫০ সালের পরের আগের শক্তিশালী El Niño ঘটনাগুলিকে ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও পূর্বাভাসে উঠে এসেছে।

তবে ‘Super El Niño’ বা ‘রেকর্ড ভাঙা El Niño’ শব্দগুলি নিয়ে কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এগুলি সংবাদমাধ্যমে বহুল ব্যবহৃত হলেও El Niño-র আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগে এমন নির্দিষ্ট নাম নেই। তাই এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী El Niño-তেই পরিণত হবে। বরং বর্তমান পূর্বাভাস বলছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার দিকে এগোচ্ছে।

ভারতের জন্য কেন বড় চিন্তা?

El Niño নিয়ে ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হল দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। অতীতে অনেক El Niño বছরে ভারতের বর্ষায় নেতিবাচক প্রভাব দেখা গিয়েছে। যদিও প্রতিটি El Niño বছরেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় না, ২০২৬ সালে ইতিমধ্যেই বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬-এ দেশের বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম ছিল। সেপ্টেম্বরেও দেশের সামগ্রিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের নিচে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের বর্ষার মরশুমে El Niño পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আগে থেকেই নজরে রাখা হয়েছিল। IMD এপ্রিলের পূর্বাভাসে পুরো মরশুমের বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯২ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা জানিয়েছিল। পরে পূর্বাভাস আরও কমিয়ে ৯০ শতাংশ করা হয়।

কৃষিতে পড়তে পারে বড় প্রভাব

বর্ষার বৃষ্টির ওপর ভারতের কৃষির একটি বড় অংশ নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বৃষ্টির ঘাটতি হলে ধান, ডাল, সয়াবিন, তুলা, ভুট্টা-সহ বিভিন্ন খরিফ ফসল ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বিশেষ করে বর্ষার শেষদিকে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে পরবর্তী রবি মরশুমের চাষেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। কম বৃষ্টির ফলে জলাধার ও ভূগর্ভস্থ জলের ওপরও চাপ বাড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন কমলে খাদ্যের দাম এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু খরা নয়, অতিবৃষ্টির আশঙ্কাও

El Niño-র প্রভাবকে শুধুমাত্র ‘বৃষ্টি কমবে’ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। ভারতের মতো বিশাল দেশে একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

চলতি বর্ষাতেও তার কিছু উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বৃষ্টির ঘাটতি থাকলেও কয়েকটি অঞ্চলে অল্প সময়ে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আবহাওয়ার অন্যতম বড় সমস্যা হতে পারে অনিয়মিত এবং চরম প্রকৃতির বৃষ্টিপাত।

বাড়তে পারে তাপমাত্রাও

El Niño সাধারণত বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। WMO-র সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০২৬ পূর্বাভাসে বিশ্বের প্রায় সমস্ত স্থলভাগে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।

ফলে দুর্বল বৃষ্টিপাতের সঙ্গে যদি তাপমাত্রাও বাড়ে, তাহলে কৃষি, জলসম্পদ, বিদ্যুৎ চাহিদা এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি হতে পারে।

২০২৭ সালেও কি প্রভাব থাকবে?

বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, El Niño ২০২৬ সালের শেষেই শেষ হয়ে যাবে — এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। WMO এবং NOAA-র পূর্বাভাসে ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত এর প্রভাব থাকার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তা থাকে। সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি এবং ভারত মহাসাগরের মতো অন্যান্য অঞ্চলের পরিবর্তনের ওপর El Niño-র প্রকৃত শক্তি ও স্থায়িত্ব নির্ভর করতে পারে।

এখন নজর কোথায়?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, ভারতের বর্ষার অবস্থা এবং সেপ্টেম্বর-পরবর্তী আবহাওয়ার পরিবর্তনের ওপর বিশেষ নজর রাখছে আবহাওয়া সংস্থাগুলি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জল সংরক্ষণ, কৃষিতে উপযোগী ফসল নির্বাচন, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি এবং চরম আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা — এই পদক্ষেপগুলি ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের শক্তিশালী El Niño এখন শুধু আবহাওয়াবিদদের আলোচনার বিষয় নয়। এর প্রভাব কৃষি থেকে খাদ্যদ্রব্যের দাম, জলসম্পদ থেকে বিদ্যুৎ — বিভিন্ন ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। তাই বছরের শেষভাগে প্রশান্ত মহাসাগরের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার দিকে গোটা বিশ্বের নজর থাকছে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -