দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদানে বদলের সম্ভাবনা, ছোট পুজোগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ভাবনা

- Advertisement -

২০২৬ সালে দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদানের নিয়মে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগের মতো সব পুজো কমিটিকে সমান অর্থ না দিয়ে আর্থিক প্রয়োজন ও বাজেটের ভিত্তিতে সাহায্য দেওয়ার কথা ভাবছে রাজ্য সরকার। ১০ লক্ষ টাকার কম বাজেটের পুজোগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে অনুদানের অঙ্ক, যোগ্যতার শর্ত ও বাজেটসীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সরকারি বিজ্ঞপ্তির পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদানে বদলের সম্ভাবনা, ছোট পুজোগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ভাবনা
Durga Puja celebrations in Bengal.

দুর্গাপুজোকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আর্থিক সহায়তার নীতি এ বছর বদলাতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন পুজো কমিটিকে নির্দিষ্ট অঙ্কের সরকারি অনুদান দেওয়া হলেও ২০২৬ সালে সেই ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার পথে হাঁটছে সরকার। এবার পুজোর আকার, বাজেট এবং আর্থিক প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রশাসনিক সূত্রে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১০ লক্ষ টাকার কম বাজেটের দুর্গাপুজোগুলিকে আর্থিক সহায়তার আওতায় রাখার একটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে। যদিও এই সীমা এখনও চূড়ান্ত নয় এবং এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়নি। ফলে কোন পুজো কমিটি অনুদান পাবে এবং কত টাকা পাবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না।

আগের বছরের অনুদান কত ছিল?

দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে সরকারি অর্থ সাহায্যের পরিমাণ কয়েক বছরে ধাপে ধাপে বেড়েছে। ২০১৮ সালে এই অনুদান চালু হওয়ার সময় কমিটিগুলি পেয়েছিল ১০ হাজার টাকা। পরবর্তী বছরগুলিতে সেই অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

২০২২ সালে অনুদানের অঙ্ক ছিল ৬০ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে দেওয়া হয় ৮৫ হাজার টাকা। আর ২০২৫ সালে প্রতিটি যোগ্য পুজো কমিটির জন্য অনুদান বাড়িয়ে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করা হয়েছিল।

গত বছর রাজ্যের প্রায় ৪৫ হাজার পুজো কমিটি সরকারি সহায়তার আওতায় এসেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নগদ অর্থের পাশাপাশি পুজো উপলক্ষে বিদ্যুৎ বিল এবং অন্যান্য কিছু সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রেও ছাড় বা সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।

২০২৬ সালে কেন বদলের কথা?

এবার সরকারের বক্তব্যের মূল জায়গা হল — যে পুজো কমিটির নিজস্ব আর্থিক সামর্থ্য যথেষ্ট, তাদের পাশাপাশি যেসব ছোট পুজো সীমিত অর্থে উৎসব আয়োজন করে, তাদের প্রয়োজন এক নয়। তাই সকলকে একই হারে অর্থ দেওয়ার বদলে আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে সহায়তার কাঠামো তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যেসব পুজো কমিটির সরকারি সাহায্যের প্রয়োজন তুলনামূলক বেশি, তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হতে পারে। তাঁর বক্তব্যের পর থেকেই নতুন নিয়মে অনুদান বণ্টনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এই নীতির ফলে বড় বাজেটের পুজো এবং সীমিত বাজেটের পুজোর মধ্যে সরকারি সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

১০ লক্ষ টাকার বাজেট — কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমানে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ১০ লক্ষ টাকার বাজেটসীমা। প্রস্তাবটি যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়, তাহলে এই সীমার নীচে থাকা পুজোগুলিই সরকারি আর্থিক সহায়তার জন্য বিবেচিত হতে পারে।

তবে ১০ লক্ষ টাকা যে চূড়ান্ত সীমা, তা এখনও বলা যাচ্ছে না। প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনার সময় এই অঙ্ক পরিবর্তিত হতে পারে। একইভাবে বাজেট কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, পুজো কমিটিকে কোন ধরনের নথি জমা দিতে হবে এবং সরকারি অর্থ পাওয়ার জন্য কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে — এসব বিষয়ও এখনও স্পষ্ট নয়।

তাই কোনও পুজো কমিটির বাজেট ১০ লক্ষ টাকার বেশি হলে তারা নিশ্চিতভাবেই অনুদান থেকে বাদ পড়বে — এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো উচিত নয়।

অনুদানের অঙ্ক বাড়বে কি?

২০২৫ সালে সরকারি অনুদানের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। ২০২৬ সালে এই অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে — এমন আলোচনা বিভিন্ন মহলে রয়েছে। কোথাও কোথাও ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত করার সম্ভাবনার কথাও প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু এই অঙ্ককে এখনও সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা যাবে না। অর্থাৎ বর্তমানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, কতগুলি পুজো কমিটি অনুদান পাওয়ার যোগ্য হবে। দ্বিতীয়ত, যোগ্য কমিটিগুলিকে কত টাকা করে দেওয়া হবে।

সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই দুই ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট নয়।

ছোট পুজো কমিটিগুলির দিকে নজর

নতুন নীতি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে পাড়ার ছোট এবং সীমিত বাজেটের পুজোগুলি। বড় পুজোগুলির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ থাকে। ছোট পুজোর ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।

ফলে সরকারি সাহায্যের সামান্য পরিমাণও অনেক ছোট পুজোর মোট বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারের সম্ভাব্য নতুন নীতিতে এই বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

তবে এর উল্টো দিকও রয়েছে। এতদিন যারা নিয়মিত সরকারি অনুদান পেয়েছেন, তাদের একটি অংশ নতুন বাজেটভিত্তিক নিয়ম চালু হলে বাদ পড়তে পারেন। ফলে পুজো কমিটিগুলির মধ্যে নতুন নিয়ম নিয়ে আগ্রহের পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।

শুধু অনুদান নয়, আরও কিছু সুবিধা নিয়েও আলোচনা

দুর্গাপুজোর সময় পুজো কমিটিগুলির খরচের একটি বড় অংশ যায় বিদ্যুৎ, প্রচার, নিরাপত্তা, অস্থায়ী পরিকাঠামো এবং বিভিন্ন অনুমোদনের পিছনে। তাই নগদ অনুদানের পাশাপাশি অন্য সরকারি সুবিধাগুলিও গুরুত্বপূর্ণ।

পুজো কমিটিগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনায় বিদ্যুৎ বিলের ছাড় এবং হোর্ডিং বা ব্যানার সংক্রান্ত করের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির সঙ্গে আলোচনা করে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থাৎ ২০২৬ সালের পুজোয় সরকারি সহায়তার বিষয়টি শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সামগ্রিকভাবে পুজো আয়োজনের খরচ কিছুটা কমানোর জন্য বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে।

পুজো কমিটিগুলির অপেক্ষা সরকারি বিজ্ঞপ্তির

দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রতিমা, মণ্ডপ, আলো এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়ে পুজো কমিটিগুলি কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই সময় সরকারি অনুদানের নিয়ম স্পষ্ট না হওয়ায় অনেক কমিটিই নিজেদের বাজেট চূড়ান্ত করার আগে সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

বিশেষ করে ছোট পুজো কমিটিগুলির কাছে অনুদানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১০ লক্ষ টাকার বাজেটসীমা কার্যকর হলে কোন খরচকে পুজোর বাজেটের মধ্যে ধরা হবে, সেই হিসাব কীভাবে করা হবে — তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এখনই কী নিশ্চিত?

এখন পর্যন্ত ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদান নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আগের মতো ব্যাপকভাবে একই অঙ্কের অনুদান দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

১০ লক্ষ টাকার কম বাজেটের পুজোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। অনুদানের পরিমাণও নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা অনুদান হবে বা ১০ লক্ষ টাকার বেশি বাজেটের পুজো কোনওভাবেই টাকা পাবে না — এই দুই দাবিকেই আপাতত সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত, চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে নয়।

সরকারের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেই পরিষ্কার হবে — কোন পুজো কমিটি আবেদন করতে পারবে, বাজেটের সীমা কত থাকবে, অনুদানের অঙ্ক কত হবে এবং কী কী শর্ত মানতে হবে।

সুতরাং ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর অনুদান নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘অনুদান হবে কি না’ নয়; বরং ‘কারা পাবেন এবং কী নিয়মে পাবেন’। সেই উত্তর পাওয়ার জন্য এখন নজর নবান্নের চূড়ান্ত ঘোষণার দিকে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -