বর্ষায় গ্রাম-বাংলায় বাড়ে সাপের উপদ্রব, বিষধর সাপ থেকে বাঁচতে কী করবেন?

- Advertisement -

বর্ষায় গ্রাম-বাংলায় বাড়ে সাপের আনাগোনা। বৃষ্টির জল ও আশ্রয়ের অভাবে সাপ অনেক সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, ঝোপঝাড় ও আবর্জনা সরানো, ইঁদুরের উপদ্রব কমানো এবং রাতে আলো ব্যবহার করলে ঝুঁকি কমে। সাপে কাটলে ঝাড়ফুঁক বা ঘরোয়া চিকিৎসা নয়, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রেখে কম নড়াচড়া করানো জরুরি। সচেতনতাই পারে প্রাণহানি এড়াতে।

বর্ষায় গ্রাম-বাংলায় বাড়ে সাপের উপদ্রব, বিষধর সাপ থেকে বাঁচতে কী করবেন?
Snake menace rises in rural Bengal during the monsoon.

বর্ষা এলেই গ্রাম-বাংলার প্রকৃতিতে আসে এক অন্যরকম পরিবর্তন। টানা বৃষ্টি, জল জমে যাওয়া, পুকুর-ডোবা ও খাল-বিলের জল বাড়ার পাশাপাশি বাড়তে থাকে সাপের আনাগোনাও। বিশেষ করে নিচু এলাকা, ধানখেত, ঝোপঝাড়, খড়ের গাদা কিংবা বাড়ির আশপাশে সাপের দেখা মেলার ঘটনা বর্ষাকালে অনেকটাই বেড়ে যায়। এর মধ্যে যেমন নির্বিষ সাপ রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ। ফলে সামান্য অসতর্কতাও কখনও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

তবে সাপের আতঙ্কে না থেকে কিছু সতর্কতা মেনে চললে বাড়ির আশপাশে সাপের আনাগোনা কমানো এবং সাপের কামড়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কেন বর্ষায় সাপ বাড়ির দিকে আসে?

বৃষ্টির সময় সাপের স্বাভাবিক আশ্রয়স্থল অনেক ক্ষেত্রে জলে ডুবে যায়। গর্ত, ঝোপঝাড় কিংবা জমির নিচু অংশে জল ঢুকে পড়লে সাপ অপেক্ষাকৃত শুকনো জায়গার খোঁজে বেরিয়ে আসে। ইঁদুর, ব্যাঙ ও অন্যান্য ছোট প্রাণীও বর্ষায় মানুষের বসতির আশপাশে বেশি দেখা যায়। খাদ্যের সন্ধানে সাপও সেইসব জায়গায় চলে আসতে পারে।

গ্রামের বাড়িতে ধানের গোলা, খড়ের গাদা, কাঠের স্তূপ, পরিত্যক্ত ঘর বা জঞ্জালের স্তূপ থাকলে সেখানে ইঁদুরের উপস্থিতি বাড়তে পারে। আর যেখানে ইঁদুরের আনাগোনা বেশি, সেখানে সাপও আশ্রয় নিতে পারে।

বাড়ির আশপাশে সাপের উপদ্রব কমাবেন কীভাবে?

প্রথমেই বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। ঝোপঝাড়, আগাছা, জমে থাকা আবর্জনা ও পরিত্যক্ত জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির দেওয়াল বা মেঝের ফাটল, দরজা-জানালার নিচের বড় ফাঁক এবং অন্যান্য সম্ভাব্য প্রবেশপথ যতটা সম্ভব বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

খড়, কাঠ, ইট কিংবা অন্যান্য সামগ্রী দীর্ঘদিন বাড়ির গা ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা ঠিক নয়। রাখতে হলে মাটি থেকে কিছুটা উঁচু করে এবং নিয়মিত পরীক্ষা করে রাখা ভালো।

ধান, চাল বা অন্যান্য খাদ্যশস্য এমনভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন যাতে ইঁদুরের উপদ্রব কমে। বাড়ির আশপাশে ইঁদুরের গর্ত থাকলে তা চিহ্নিত করে নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।

রাতে বাইরে বেরোনোর সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অন্ধকার জায়গায় খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলা উচিত। প্রয়োজন হলে টর্চ ব্যবহার করতে হবে এবং পা ঢাকা জুতো বা গামবুট পরা নিরাপদ।

বর্ষাকালে ঘরে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা ভালো অভ্যাস। মাটিতে সরাসরি না শুয়ে সম্ভব হলে খাটে ঘুমানোও নিরাপত্তার দিক থেকে উপকারী। তবে কোনও জায়গায় সাপ থাকার সন্দেহ থাকলে খাটের নিচে, কাপড়ের স্তূপ বা জুতোর ভিতর হাত দেওয়া উচিত নয়।

ঘরে সাপ ঢুকলে কী করবেন?

ঘরে সাপ ঢুকে পড়লে আতঙ্কিত হয়ে সাপটিকে মারতে যাওয়া বিপজ্জনক। সাপকে কোণঠাসা করলে সেটি আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণ করতে পারে। তাই দূরত্ব বজায় রেখে অন্যদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে ঘরের দরজা-জানালা খুলে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী বা স্থানীয় বন দফতরের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

সাপটি বিষধর কি না, তা চেহারা দেখে নিশ্চিতভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত নয়। কারণ ভুলভাবে সাপ শনাক্ত করার চেষ্টা চিকিৎসা নিতে দেরি করাতে পারে।

সাপে কাটলে কী করবেন?

সাপে কাটার ঘটনা ঘটলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে এবং যতটা সম্ভব কম নড়াচড়া করাতে হবে। কামড়ের জায়গার অঙ্গটি স্থির রাখা জরুরি। আংটি, বালা, ঘড়ি বা আঁটসাঁট জিনিস থাকলে দ্রুত খুলে দেওয়া ভালো, কারণ বিষের প্রভাবে শরীরের ওই অংশ ফুলে যেতে পারে।

সাপে কাটার পর যত দ্রুত সম্ভব নিকটবর্তী হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। বিষধর সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে অ্যান্টিভেনমই প্রধান নির্দিষ্ট চিকিৎসা, তাই বাড়িতে বসে চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়।

যে ভুলগুলি একেবারেই করবেন না

সাপে কাটার পর ক্ষতস্থান কেটে বিষ বের করার চেষ্টা, মুখ দিয়ে বিষ চোষা, বরফ লাগানো, রাসায়নিক বা ভেষজ পদার্থ লাগানো — এসব বিপজ্জনক হতে পারে। শক্ত করে দড়ি, কাপড় বা অন্য কিছু দিয়ে আক্রান্ত অঙ্গের রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেওয়াও উচিত নয়।

অনেক জায়গায় এখনও সাপে কাটার পর ওঝা, গুনিন বা ঝাড়ফুঁকের সাহায্য নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এতে চিকিৎসা পেতে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হতে পারে। সাপের কামড়কে জরুরি চিকিৎসার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

বর্ষাকালে সাপের উপস্থিতি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, ইঁদুরের উপদ্রব কমানো, রাতে আলো ব্যবহার করা, খালি পায়ে না হাঁটা এবং ঘরের সম্ভাব্য প্রবেশপথ বন্ধ রাখার মতো সাধারণ সতর্কতা সাপের কামড়ের ঝুঁকি কমাতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ভয় নয়, সচেতনতা। সাপ দেখলে সেটিকে ধরতে বা মারতে না গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীর সাহায্য নেওয়া উচিত। আর সাপে কাটার ঘটনা ঘটলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনোই পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -