খড় পোড়ালে জমির রেকর্ডে ‘রেড এন্ট্রি’! কেন্দ্রের নতুন প্রস্তাব ঘিরে কৃষিমহলে আলোচনা

- Advertisement -

খড় পোড়ানো বন্ধ করতে কৃষিজমির সরকারি রেকর্ডে ‘রেড এন্ট্রি’ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে কেন্দ্র। খসড়া নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমবারের ঘটনায় ১৫ মাস পর্যন্ত এই এন্ট্রি থাকতে পারে। পুনরায় খড় পোড়ানো বা ক্ষতিপূরণ না দিলে মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সংগৃহীত পরিবেশগত ক্ষতিপূরণের অর্থ খড় ব্যবস্থাপনা, কৃষিযন্ত্র, প্রশিক্ষণ ও বিকল্প ব্যবস্থায় ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। তবে নিয়মটি এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

খড় পোড়ালে জমির রেকর্ডে ‘রেড এন্ট্রি’! কেন্দ্রের নতুন প্রস্তাব ঘিরে কৃষিমহলে আলোচনা
Proposed Red Entry on Agricultural Land Records to Curb Stubble Burning

ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব এনেছে কেন্দ্র। নতুন খসড়া নিয়মে খড় পোড়ানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কৃষিজমির সরকারি রেকর্ডে ‘রেড এন্ট্রি’ বা লাল দাগ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ আদায় এবং পুনরায় একই ধরনের ঘটনা ঘটলে সেই রেকর্ড আরও দীর্ঘ সময় বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে শীতকালে বায়ুদূষণ দীর্ঘদিন ধরেই বড় সমস্যা। এই সময় দিল্লির বায়ুমান খারাপ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পদূষণ, নির্মাণকাজের ধুলো এবং আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সেই সমস্যা মোকাবিলায় কৃষিক্ষেত্রে ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

কী এই ‘রেড এন্ট্রি’?

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনও কৃষিজমিতে খড় পোড়ানোর ঘটনা শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট জমির land revenue record-এ ‘রেড এন্ট্রি’ করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় এই এন্ট্রি সর্বোচ্চ ১৫ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা বলা হয়েছে।

তবে শুধু একবারের ঘটনা দিয়ে বিষয়টি শেষ হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একই জমিতে আবার ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ঘটনা ঘটলে অথবা নির্ধারিত Environmental Compensation বা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করলে রেড এন্ট্রির মেয়াদ আরও ১৫ মাস বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কোনও লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটলে এবং প্রযোজ্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হলে ১৫ মাস পরে এই এন্ট্রি তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

কেন এমন পদক্ষেপ?

ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা খড় সরাতে অনেক সময় কৃষকেরা আগুন ব্যবহার করেন। এতে অল্প সময়ে জমি পরিষ্কার করা সম্ভব হলেও ধোঁয়া ও বিভিন্ন দূষণকারী পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লি-NCR-এ শীতকালে বাতাসের গতিবেগ কমে গেলে এবং বায়ুমণ্ডলের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দূষণ আটকে থাকতে পারে।

কেন্দ্রের প্রস্তাবের লক্ষ্য তাই শুধু জরিমানা আদায় নয়, কৃষকদের ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় উৎসাহিত করা। খড় মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া, বেলিং করে সংগ্রহ করা, কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পক্ষেত্রে biomass হিসেবে ব্যবহার — এ ধরনের বিকল্প পদ্ধতির ওপর ইতিমধ্যেই বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রেড এন্ট্রির প্রভাব কোথায় পড়তে পারে?

জমির সরকারি রেকর্ডে কোনও নেতিবাচক নথিভুক্তি হলে তার প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া, জমি সংক্রান্ত লেনদেন বা বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই ধরনের রেকর্ড ভবিষ্যতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কৃষিমহলে আলোচনা রয়েছে।

এই কারণেই খড় পোড়ানোর ঘটনা শনাক্ত করার পদ্ধতি এবং রেড এন্ট্রি দেওয়ার আগে যথাযথ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ভুল শনাক্তকরণ হলে কৃষক যাতে আপত্তি জানাতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনের সুযোগ পান, সেই ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ক্ষতিপূরণের টাকা কোথায় ব্যবহার হবে?

খসড়া ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল Environmental Compensation থেকে পাওয়া অর্থকে ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনার কাজেই ব্যবহার করার প্রস্তাব।

এই অর্থের মাধ্যমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে সহায়তা, Crop Residue Management-এর পরিকাঠামো তৈরি, biomass সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ফসলের বৈচিত্র্যকরণ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির মতো কাজে অর্থ ব্যয় করার প্রস্তাব রয়েছে।

অর্থাৎ, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, খড় ব্যবস্থাপনার বিকল্প পরিকাঠামো তৈরির দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কৃষকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, খড় পোড়ানো বন্ধ করতে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা জরিমানা যথেষ্ট নয়। কৃষকদের হাতে সময়মতো উপযুক্ত যন্ত্রপাতি, কম খরচে ফসলের অবশিষ্টাংশ সরানোর ব্যবস্থা এবং খড় বিক্রি বা পুনর্ব্যবহারের বাজার তৈরি করা প্রয়োজন।

ধান কাটার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কৃষককে পরবর্তী ফসলের জন্য জমি প্রস্তুত করতে হয়। ফলে খড় সরানোর সহজ, দ্রুত এবং আর্থিকভাবে কার্যকর বিকল্প না থাকলে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কৃষকদের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।

এই কারণে সরকারি ভর্তুকি, কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা এবং biomass-এর বাজার সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার — রেড এন্ট্রি সংক্রান্ত এই ব্যবস্থা এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ এটি চূড়ান্ত আইন বা কার্যকর নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও আপত্তি বিবেচনার পর নিয়মে পরিবর্তন আসতে পারে।

আগেও কৃষকদের ক্ষেত্রে রেড এন্ট্রি ব্যবস্থার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কৃষক সংগঠনগুলোর একাংশ এই ধরনের ব্যবস্থার সম্ভাব্য আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে উঠে এসেছে।

সামনে কী হতে পারে?

চূড়ান্ত নিয়মে রেড এন্ট্রির সংজ্ঞা, প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, আপিলের সুযোগ এবং এন্ট্রি তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা কতটা সহজলভ্য করা হচ্ছে, সেটিও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

খড় পোড়ানো কমানো গেলে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে কৃষকদের জীবিকা ও বাস্তব কৃষিকাজের পরিস্থিতির সঙ্গে পরিবেশগত লক্ষ্যকে কীভাবে সামঞ্জস্য করা যায়, সেটিই এই প্রস্তাবের সফল বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, কেন্দ্রের প্রস্তাবিত ‘রেড এন্ট্রি’ ব্যবস্থা খড় পোড়ানোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপকে আরও কঠোর করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণের অর্থ ব্যবহার করে ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনার বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবও রয়েছে। এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত এবং পরবর্তী সময়ে খসড়া নিয়মের চূড়ান্ত রূপের দিকে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -