কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে বীরভূমের তারাপীঠে ভক্তদের ঢল নেমেছে। মা তারার দর্শন ও বিশেষ পুজোয় অংশ নিতে রাজ্য ও ভিনরাজ্য থেকে বহু পুণ্যার্থী এসেছেন। বিপুল ভিড় সামলাতে প্রায় ৪ হাজার পুলিশ, CCTV, ড্রোন ও ওয়াচটাওয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। দ্বারকা নদীর তীরে বিশেষ আরতি, হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি এবং ভক্তদের যাতায়াতে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ধর্মীয় আবহে মুখর গোটা তারাপীঠ।

ভাদ্র মাসের কৌশিকী অমাবস্যাকে ঘিরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই উৎসবের আবহ বীরভূমের তারাপীঠে। মা তারার দর্শন ও বিশেষ পুজোয় অংশ নিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি ভিনরাজ্য থেকেও ভক্তরা এসে পৌঁছেছেন। তিথির মূল রাত যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে পুণ্যার্থীদের ভিড়। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এবারের কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে ছয় লক্ষেরও বেশি মানুষের সমাগম হতে পারে। বিপুল ভিড় সামাল দিতে মন্দির চত্বর থেকে শুরু করে গোটা তারাপীঠ এলাকায় জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ও পরিষেবা ব্যবস্থা।
কৌশিকী অমাবস্যা তারাপীঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই বিশেষ তিথি ‘তারা রাত্রি’ নামেও পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস ও ধর্মীয় পরম্পরায় এই রাত মা তারার আরাধনা এবং সাধনার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে প্রতি বছরই এই তিথিকে কেন্দ্র করে তারাপীঠে বিপুল সংখ্যক ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী এবং তন্ত্রসাধকদের সমাগম হয়। ২০২৬ সালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সকাল থেকেই বাড়ছে ভিড়
বুধবার রাত থেকেই তারাপীঠে ভক্তদের আনাগোনা শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মন্দির সংলগ্ন এলাকা, বাজার এবং বিভিন্ন যাত্রাপথে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের অনেকেই রাতের বিশেষ পুজো ও মায়ের দর্শনের জন্য আগে থেকেই তারাপীঠে পৌঁছেছেন।
মন্দির চত্বর ও আশপাশের এলাকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে রয়েছে ড্রপ গেট এবং ওয়াচটাওয়ার। পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে CCTV এবং ড্রোন। কেবল মন্দির নয়, তারাপীঠের প্রবেশ ও বেরোনোর রাস্তাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তায় ৪ হাজার পুলিশ
এবারের উৎসবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ৪ হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। গোটা এলাকায় ২৭টি সহায়তা কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। নজরদারির জন্য রয়েছে প্রায় ৪০০টি CCTV ক্যামেরা, ১১টি ওয়াচটাওয়ার এবং ড্রোন। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ক্যামেরাও ব্যবহার করা হচ্ছে।
মহিলা ভক্তদের নিরাপত্তার জন্য মহিলা পুলিশকর্মীদের বিশেষ টহলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে কোনও শিশু বা প্রবীণ সদস্য হারিয়ে গেলে দ্রুত তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সহায়তা কেন্দ্রগুলিকেও সক্রিয় রাখা হয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তায় বাড়তি নজর
সাম্প্রতিক সময়ে তারাপীঠের একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনার পর এবারের কৌশিকী অমাবস্যায় অগ্নিনিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে প্রশাসন। প্রায় ২০০ জন দমকলকর্মীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প-সহ আটটি রোবট ফায়ার টেন্ডারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ২৫ সদস্যের বিশেষ দলও প্রস্তুত রয়েছে।
হোটেল ও অতিথিশালাগুলিতেও অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত পরীক্ষা ও মহড়া চালানো হয়েছে। উৎসব চলাকালীন কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার জন্য দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় রাখা হয়েছে।
নদীর ঘাটেও কড়া নজরদারি
কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে শুধু মন্দির নয়, দ্বারকা নদীর ঘাটগুলিতেও ভিড় বাড়ছে। ভক্তদের নিরাপত্তার জন্য ঘাটগুলিতে ব্যারিকেড ও জাল দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্পিডবোট ও উদ্ধারকারী ভ্যান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এবার কৌশিকী অমাবস্যার আগে দ্বারকা নদীর তীরে বিশেষ আরতির আয়োজনও নজর কেড়েছে। বুধবার রাতেই নদীর তীরে একাধিকবার আরতি অনুষ্ঠিত হয়। মধ্যরাতেও মহাশ্মশানকে সামনে রেখে নদীতে আয়োজিত আরতি দেখতে ভক্তদের ভিড় ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর নদীর তীরে এই ধরনের ধর্মীয় আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও উৎসাহ দেখা দিয়েছে।
প্রথমবার হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি
এবারের কৌশিকী অমাবস্যার আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি। ভক্তদের উপস্থিতি ও ধর্মীয় আবহকে আরও উৎসবমুখর করে তুলতে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পাশাপাশি রামপুরহাট থেকে তারাপীঠ পর্যন্ত রাস্তা আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ী মঞ্চ ও পরিষেবা কেন্দ্রও তৈরি করা হয়েছে।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও উৎসবের প্রস্তুতির জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভক্তদের পরিষেবা এবং পরিকাঠামোগত ব্যবস্থার উন্নয়নে সেই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
ভক্তদের জন্য বিশেষ ট্রেন
বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর কথা মাথায় রেখে পূর্ব রেলও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাওড়া–রামপুরহাট রুটে বিশেষ ট্রেন চালানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি কয়েকটি নিয়মিত ট্রেনেও অতিরিক্ত সাধারণ কোচ যুক্ত করা হয়েছে। হাওড়া–রামপুরহাট শহিদ এক্সপ্রেস, কবিগুরু এক্সপ্রেস এবং গণদেবতা এক্সপ্রেসেও অতিরিক্ত কোচের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পূর্ব রেলের এই উদ্যোগে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা থেকে তারাপীঠে আসা ভক্তদের যাতায়াত কিছুটা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে উৎসবের মূল দিন ও পরের দিন ট্রেনে বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা।
কখন মূল পুজো?
২০২৬ সালে কৌশিকী অমাবস্যার তিথি ১০ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে শুরু হয়ে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত থাকবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী তিথি শুরু ও শেষের সময় নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে সামান্য পার্থক্য থাকলেও, রাত্রিকালীন পুজোর গুরুত্বের কারণে ১০ সেপ্টেম্বর রাতকেই মূল ধর্মীয় আয়োজনের সময় হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তারাপীঠে এই রাতকে ঘিরেই মন্দিরে বিশেষ পুজো, ভোগ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালিত হবে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দির ও আশপাশের এলাকায় ভক্তদের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে প্রশাসনের অনুমান।
প্রশাসনের আবেদন
বিপুল ভিড়ের মধ্যে ভক্তদের ধৈর্য ধরে প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার আবেদন জানানো হয়েছে। মন্দিরে প্রবেশের সময় ধাক্কাধাক্কি না করা, নির্দিষ্ট ব্যারিকেড ও প্রবেশপথ ব্যবহার করা এবং নদীর ঘাটে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ ও মূর্তি স্পর্শের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য একদিকে যেমন মন্দিরের নিয়ম ও ধর্মীয় আচার বজায় রাখা, অন্যদিকে বিপুল ভিড়ের মধ্যে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কমানো।
সব মিলিয়ে কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে এখন উৎসবের চূড়ান্ত প্রস্তুতি তারাপীঠে। একদিকে মা তারার দর্শনের আশায় হাজার হাজার মানুষের আগমন, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও পরিষেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি — সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত তারাপীঠে ভক্তসমাগম আরও বাড়ার সম্ভাবনাই দেখছে প্রশাসন। ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য এবং বিপুল জনসমাগমের এই উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করাই এখন প্রশাসন ও মন্দির কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য।

