পুজোর আগে কলকাতায় কড়া নজরদারি, ৪০ খাবারের দোকানের লাইসেন্স বাতিল

- Advertisement -

কলকাতায় খাদ্য নিরাপত্তা অভিযানে ৫৯২টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ৪০টি রেস্তরাঁ ও খাবারের প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করেছে কলকাতা পুরসভা। বাসি ও অনুপযুক্ত খাবার, অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, ইঁদুর-আরশোলার উপস্থিতি এবং খাদ্য সংরক্ষণে অনিয়ম ধরা পড়েছে। অভিযানে ১,২২৪ কেজি অনুপযুক্ত খাবার নষ্ট ও ১৬১টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পুজোর আগে নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে।

পুজোর আগে কলকাতায় কড়া নজরদারি, ৪০ খাবারের দোকানের লাইসেন্স বাতিল

দুর্গাপুজোর আগে কলকাতার রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকান এবং বিভিন্ন খাবারের প্রতিষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড়সড় অভিযান চালাল কলকাতা পুরসভা। সপ্তাহব্যাপী এই অভিযানে শহরের ৫৯২টি খাদ্য সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে। পরিদর্শনের পর খাদ্য নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য-সংক্রান্ত লাইসেন্স সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করেছে পুরসভা। একইসঙ্গে ১,২২৪ কেজি অনুপযুক্ত বা নিম্নমানের খাবার নষ্ট করা হয়েছে এবং ১৬১টি খাদ্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

কলকাতা পুরসভার এই অভিযান হয় ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের খাদ্য নিরাপত্তা সপ্তাহকে কেন্দ্র করে। রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকানের পাশাপাশি হোটেল, ক্লাব, বাজার, শপিং মলের ফুড কোর্ট এবং অন্যান্য খাবারের প্রতিষ্ঠানও ছিল নজরদারির আওতায়। পুরসভার প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা। দুর্গাপুজোর আগে শহরে খাদ্য ব্যবসার পরিমাণ ও ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে চলায় এই নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কী কী অনিয়ম ধরা পড়েছে?

পুরসভার আধিকারিকদের পরিদর্শনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে গুরুতর স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও খাবার সংরক্ষণের জায়গায় আরশোলা ও ইঁদুরের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। কোথাও আবার বাসি খাবার, ছত্রাক ধরা খাদ্যপণ্য এবং অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে রান্নাঘর ও খাদ্য রাখার জায়গার পরিচ্ছন্নতাও সন্তোষজনক ছিল না বলে আধিকারিকরা জানিয়েছেন।

বিশেষ করে মিষ্টির দোকানগুলির স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পুরসভা। একটি প্রতিষ্ঠানের ফ্রিজের ভিতরেই আরশোলা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পুরসভার শীর্ষ আধিকারিক। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানে খাদ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্সের ঘাটতিও ধরা পড়েছে। কোথাও খুচরো বিক্রির লাইসেন্স থাকলেও উৎপাদনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।

১,২২৪ কেজি খাবার নষ্ট

অভিযানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল বিপুল পরিমাণ অনুপযুক্ত খাবার নষ্ট করা। পুরসভার তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহের অভিযানে প্রায় ১,২২৪ কেজি খাবার বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে মাছ, মাংস এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যও ছিল। বিভিন্ন বাজার ও খাদ্য ব্যবসা কেন্দ্রে সংরক্ষিত পণ্যের গুণমান পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলি সরিয়ে দেওয়া হয়।

হগ মার্কেট, মানিকতলা, পাতিপুকুর মাছের বাজার এবং ট্যাংরা-সহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যবাজারেও অভিযান চালানো হয়। বাজারগুলিতে খাদ্য সংরক্ষণ, পচনশীল পণ্যের অবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি খতিয়ে দেখা হয়। অভিযানের একটি দিনে বাজারগুলি থেকেই বিপুল পরিমাণ মাছ-মাংস ও অন্যান্য অনুপযুক্ত খাদ্যপণ্য নষ্ট করা হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু ৪০টি প্রতিষ্ঠান নয়, আরও বহু জায়গায় নোটিস

পুরসভার অভিযান কেবল লাইসেন্স সাসপেন্ড করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মোট ৫৯২টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের পর ১৬১টি খাদ্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আরও বহু প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম মেনে চলার জন্য নোটিস দেওয়া হয়েছে। ১১২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সেকশন ৩৮-এর নোটিস এবং ৮৯টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে রিফ্রেন নোটিস জারি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, পুরসভার নজরদারির আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি বড় অংশকে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে, আর গুরুতর অনিয়ম পাওয়া জায়গাগুলির বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে আরও কড়া পদক্ষেপ।

কোন কোন পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে এসেছে?

লাইসেন্স সাসপেনশনের তালিকায় কলকাতার কয়েকটি পরিচিত খাবারের প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের নামও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে Balaram Mullick & Radharaman Mullick, Don Giovannis, Kareem’s, Nizam’s-সহ বেশ কয়েকটি পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট আউটলেটের নাম এসেছে। তবে কোনও ব্র্যান্ডের সমস্ত শাখার বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে — এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা আউটলেটের বিরুদ্ধে।

এক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। লাইসেন্স সাসপেন্ড হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। পুরসভার বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে চিহ্নিত ত্রুটি সংশোধন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে চলার প্রমাণ দিতে হবে। এরপর পুনরায় পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে। নিয়ম মেনে চললে পরবর্তী সময়ে লাইসেন্স পুনর্বহালের সুযোগ রয়েছে।

পুজোর আগে কেন বাড়ছে নজরদারি?

দুর্গাপুজো সামনে। উৎসবের মরসুমে কলকাতার রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকান, ফুড কোর্ট এবং বিভিন্ন খাবারের প্রতিষ্ঠানে ক্রেতার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে খাবারের গুণমান এবং রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে।

পুরসভার প্রশাসনের বক্তব্য, খাবারের ব্যবসায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। খাবার নিরাপদ রাখা, সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বজায় রাখা — এই বিষয়গুলিকে আর কোনওভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না।

পুরসভা জানিয়েছে, এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও চলবে। অর্থাৎ, পুজোর আগে একবার অভিযান চালিয়ে থেমে যাওয়ার পরিবর্তে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?

কলকাতা পুরসভার এই অভিযান সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। বাইরে খাবার খাওয়ার সময় শুধু প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা নয়, খাবারের পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার দিকেও নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে পচা, বাসি বা অস্বাভাবিক গন্ধযুক্ত খাবার নিয়ে সন্দেহ হলে তা না খাওয়াই নিরাপদ।

সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর আগে কলকাতায় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে পুরসভার এই অভিযান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ৫৯২টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, ৪০টির লাইসেন্স সাসপেন্ড এবং ১,২২৪ কেজি অনুপযুক্ত খাবার ধ্বংসের পর স্পষ্ট যে শহরের খাদ্য ব্যবসায় স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রশাসন এবার আরও কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে। সামনে উৎসবের মরসুমে এই নজরদারি আরও বাড়ে কি না, এখন সেটাই দেখার।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -