আর জি কর কাণ্ডের দুই বছর পর তদন্তে ফের গতি এসেছে। কলকাতা হাইকোর্ট CBI-কে আগের তদন্তের বাইরে গিয়ে নতুন করে ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর ঘটনার রাতে হাসপাতালে উপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মীদের বক্তব্য নিয়ে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান করবে। পুলিশি গাফিলতির অভিযোগে তিন IPS আধিকারিকের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের পদক্ষেপও মামলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হল। কিন্তু মামলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি। মূল অপরাধে দোষী সাব্যস্ত সঞ্জয় রায়ের সাজা হয়ে গেলেও ঘটনার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, সম্ভাব্য প্রমাণ নষ্ট বা ধামাচাপার অভিযোগ এবং তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এখনও রয়েছে। এর মধ্যেই মামলায় নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট CBI-কে নতুন করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরও এবার আলাদা করে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ CBI-কে
৬ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ CBI-এর নতুন তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, আগের তদন্তের ফলাফলকে ভিত্তি ধরে নতুন তদন্ত চালানো যাবে না। ঘটনাটিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে তদন্ত করতে হবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, তদন্তের পরিধি শুধু হাসপাতালের সেমিনার হল বা ঘটনাস্থলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঘটনার রাত থেকে শুরু করে মৃতদেহের শেষকৃত্য পর্যন্ত গোটা ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখতে হবে। আদালত জানতে চেয়েছে, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না এবং ঘটনার পরপর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
CBI-এর তরফে আদালতকে জানানো হয়েছে, নতুন তদন্তে বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তকারী আধিকারিকরা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আদালত অবশ্য দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উপর জোর দিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি ২৮ আগস্ট নির্ধারিত হয়েছে। সেই সময় CBI-এর কাছ থেকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তদন্তকারী আধিকারিকও বদলেছে
মামলার নতুন তদন্তে CBI তদন্তকারী আধিকারিক পরিবর্তন করেছে। সিমা পাহুজার জায়গায় সন্দীপনী গর্গকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
নিহত চিকিৎসকের পরিবারের পক্ষ থেকে তদন্তের গতি এবং কিছু বিষয় যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আগে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। তদন্তকারী আধিকারিক পরিবর্তনের পর নতুন দল কোন কোন তথ্যকে গুরুত্ব দেয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
এবার স্বাস্থ্য দফতরেরও অভ্যন্তরীণ তদন্ত
৮ আগস্ট রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দফতর এবার আর জি কর কাণ্ড নিয়ে আলাদা করে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান করবে।
স্বাস্থ্য দফতরের মন্ত্রী শরদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ ও ৯ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে আর জি করের চেস্ট মেডিসিন বিভাগে উপস্থিত চিকিৎসক, ইন্টার্ন এবং কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বিশেষ করে ঘটনার রাতে নিহত চিকিৎসকের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বক্তব্য নেওয়া হবে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, ওই চিকিৎসক স্বাস্থ্য দফতরের অধীনে কর্মরত ছিলেন এবং কর্তব্যরত অবস্থাতেই ধর্ষণ ও খুনের শিকার হন। কিন্তু ঘটনার পর স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে কোনও অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়নি। এবার সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ জানতেই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতর তদন্তকারী সংস্থা নয় — তাই তাদের পাওয়া তথ্য সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ঘটনার রাতের সহকর্মীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্য দফতরের নতুন অনুসন্ধানের ফলে ঘটনার রাতের সময়সীমা আবারও তদন্তের কেন্দ্রে চলে এসেছে। নিহত চিকিৎসক ৮ আগস্ট রাতে পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। এরপর দায়িত্ব শেষ করে সহকর্মীদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার কথা তদন্তে উঠে এসেছে। পরে তিনি সেমিনার হলে বিশ্রাম নিতে যান।
সেই সময় তাঁর সঙ্গে কারা ছিলেন, কখন কে কোথায় ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল — এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে সহকর্মী ও কর্মীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নিহত চিকিৎসকের বাবা-মায়ের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে ঘটনার রাতের সহকর্মীদের ভূমিকা ও বক্তব্য আরও গভীরভাবে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
‘ধামাচাপা’-র অভিযোগও তদন্তের আওতায়
আর জি কর কাণ্ডের তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল ঘটনার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রমাণ নষ্ট বা তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে।
এই অভিযোগ খতিয়ে দেখতেই মে মাসে কলকাতা হাইকোর্ট CBI-এর তিন সদস্যের বিশেষ তদন্ত দল বা SIT গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই দলকে ২০২৪ সালের ৯ আগস্টের রাত থেকে মৃতদেহের শেষকৃত্য পর্যন্ত ঘটনাক্রম পরীক্ষা করতে বলা হয়। আদালত CBI-কে এই তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে।
রাজ্যের তিন IPS আধিকারিক সাসপেন্ড
এর পাশাপাশি ২০২৬ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আর জি কর কাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে কথিত গাফিলতি ও মামলাটি সামলানোর পদ্ধতি নিয়ে তিনজন IPS আধিকারিককে সাসপেন্ড করে।
সাসপেন্ড হওয়া আধিকারিকদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, তৎকালীন ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং ডিসি (নর্থ) অভিষেক গুপ্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
রাজ্যের এই পদক্ষেপকে CBI-এর মূল অপরাধের তদন্তের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। মূল ধর্ষণ ও খুনের তদন্ত CBI-এর হাতেই রয়েছে। রাজ্যের পদক্ষেপ মূলত প্রাথমিক পুলিশি তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নে।
এখন নজর ২৮ আগস্টের দিকে
দুই বছর পর আর জি কর মামলায় একসঙ্গে একাধিক স্তরে তদন্তের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে CBI-এর বিশেষ দল কথিত ধামাচাপা ও প্রমাণ সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখছে, অন্যদিকে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর ঘটনার রাতে হাসপাতালে উপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মীদের বক্তব্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টও CBI-কে আগের তদন্তের প্রভাব থেকে বেরিয়ে নতুন করে গোটা ঘটনাক্রম পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে ২৮ আগস্টের শুনানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেদিন CBI-এর অগ্রগতি রিপোর্টে কী তথ্য উঠে আসে, তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে — সেদিকেই নজর থাকবে।
আর জি কর কাণ্ডের মূল অপরাধে সঞ্জয় রায়ের সাজা হলেও, বৃহত্তর তদন্তে আরও কোনও ব্যক্তি বা ভূমিকা সামনে আসে কি না, কিংবা ঘটনার পর কোনও প্রমাণ নষ্ট বা ধামাচাপার চেষ্টা হয়েছিল কি না — এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অপেক্ষমাণ। নতুন তদন্ত ও স্বাস্থ্য দফতরের অনুসন্ধান সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার পথ কতটা খুলতে পারে, এখন সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
আইনি সতর্কতা : এই প্রতিবেদনে তদন্তাধীন অভিযোগ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য বা অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না, যতক্ষণ না তা আদালতে প্রমাণিত হয়।

