মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বৃষ্টিবনের Walking Palm বা Socratea exorrhiza বহুদিন ধরেই ‘হাঁটা গাছ’ নামে পরিচিত। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী এটি শিকড়ের সাহায্যে ধীরে ধীরে স্থান পরিবর্তন করে। তবে আধুনিক গবেষণায় এ দাবির পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি। বিজ্ঞানীদের মতে, এর অস্বাভাবিক শিকড়ই মূল বৈশিষ্ট্য, প্রাণীর মতো হাঁটার ক্ষমতা নয়।

পৃথিবীর বিস্ময়কর উদ্ভিদজগত নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। সেই কৌতূহলের অন্যতম বিষয় হলো Walking Palm বা কথিত ‘হাঁটা গাছ’। বহু বছর ধরে বই, প্রামাণ্যচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, এই গাছ নাকি ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। এমনকি কেউ কেউ এটিকে পৃথিবীর একমাত্র ‘হাঁটা গাছ’ বলেও উল্লেখ করেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কি সত্যিই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
Walking Palm কী?
Walking Palm-এর বৈজ্ঞানিক নাম Socratea exorrhiza। এটি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণমণ্ডলীয় বৃষ্টিবনে জন্মানো একটি পামজাতীয় গাছ। বিশেষ করে কোস্টারিকা, পানামা, ইকুয়েডর, পেরু, কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের কিছু অংশে এই গাছ বেশি দেখা যায়।
এই গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল এর লম্বা, খুঁটির মতো উঁচু শিকড়। মাটির ওপরে কয়েক ফুট পর্যন্ত উঠে থাকা এসব শিকড় গাছটিকে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গাছটি যেন অনেকগুলো পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকেই ‘Walking Palm’ বা ‘হাঁটা গাছ’ নামটির জনপ্রিয়তা।
কোথা থেকে এল ‘হাঁটা গাছ’-এর ধারণা?
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কিছু গবেষক ও প্রকৃতিবিদ ধারণা দেন, Walking Palm নতুন দিকে শিকড় তৈরি করতে পারে এবং পুরোনো দিকের শিকড় ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে দীর্ঘ সময়ে গাছটি কয়েক সেন্টিমিটার বা তারও বেশি দূরত্বে সরে যেতে পারে।
এই ধারণা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা ও প্রামাণ্যচিত্রে Walking Palm-কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন গাছটি ধীরে ধীরে ‘হেঁটে’ আলো বা ভালো পরিবেশের দিকে চলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
বিজ্ঞান কী বলছে?
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা অবশ্য এই দাবিকে নিশ্চিতভাবে সমর্থন করে না। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলছেন, Walking Palm-এর শিকড়ের গঠন সত্যিই ব্যতিক্রমী। নতুন শিকড় তৈরি হওয়া এবং পুরোনো শিকড় ক্ষয় হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গাছটি সচেতনভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ‘হেঁটে’ যায় — এমন নির্ভরযোগ্য গবেষণালব্ধ প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
কিছু গবেষক মনে করেন, গাছটির অবস্থানে সামান্য পরিবর্তন ঘটলেও সেটি মাটির ক্ষয়, ঢালের পরিবর্তন, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বা পরিবেশগত কারণের ফল হতে পারে। এটিকে প্রাণীর মতো চলাচল বা হাঁটা বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
তাহলে Walking Palm-এর বিশেষত্ব কী?
Walking Palm-কে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও এর কিছু বৈশিষ্ট্য সত্যিই অসাধারণ।
- মাটির ওপরে উঠে থাকা শক্ত শিকড় গাছটিকে স্থিতিশীল রাখে।
- জলাবদ্ধ বা অসমতল মাটিতেও এটি সহজে টিকে থাকতে পারে।
- বনভূমির পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষায় এ ধরনের শিকড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- ঝড় বা প্রবল বৃষ্টির সময় গাছকে অতিরিক্ত সমর্থন দেয়।
অর্থাৎ, এর শিকড়ের গঠনই গাছটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, ‘হাঁটা’ নয়।
সামাজিক মাধ্যমে কেন এত বিভ্রান্তি?
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। Walking Palm-কে ‘হাঁটা গাছ’ হিসেবে উপস্থাপন করলে মানুষের আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব পোস্টে বৈজ্ঞানিক গবেষণার উল্লেখ থাকে না।
ফলে বহু মানুষ ধারণা করেন যে Walking Palm সত্যিই প্রাণীর মতো স্থান পরিবর্তন করতে পারে। বাস্তবে বিষয়টি এখনও গবেষণার আলোচ্য এবং এ নিয়ে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
উদ্ভিদ কি একেবারেই নড়াচড়া করতে পারে না?
উদ্ভিদ স্থির জীব হলেও তারা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। সূর্যালোকের দিকে কাণ্ড ও পাতা বাঁকানো, লতানো গাছের আশ্রয় খোঁজা, সূর্যমুখী ফুলের সূর্যের দিকে মুখ ঘোরানো, কিংবা লজ্জাবতী গাছের স্পর্শে পাতা বন্ধ হয়ে যাওয়া — এসবই উদ্ভিদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
তবে এসব নড়াচড়া গাছের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৃদ্ধি বা কোষীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে। এগুলো প্রাণীর মতো হাঁটা বা সচেতনভাবে স্থান পরিবর্তনের সমতুল্য নয়।
গবেষণা এখনও চলছে
Walking Palm নিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের আগ্রহ এখনও রয়েছে। ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি এবং নতুন গবেষণা এই গাছ সম্পর্কে আরও তথ্য দিতে পারে। তবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে Walking Palm সত্যিই ‘হেঁটে’ স্থান পরিবর্তন করে — এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত নয়।
Walking Palm প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি। এর খুঁটির মতো শিকড় এবং বৃষ্টিবনের পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল একে অন্যান্য পামগাছ থেকে আলাদা করেছে। তবে ‘হাঁটা গাছ’ হিসেবে এর পরিচিতি মূলত একটি জনপ্রিয় ধারণা, যা এখনও শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অপেক্ষায় রয়েছে।
তাই Walking Palm সম্পর্কে তথ্য জানার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচলিত দাবির পরিবর্তে গবেষণাভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। বিজ্ঞান নতুন তথ্যের মাধ্যমে আমাদের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু বর্তমান প্রমাণ অনুযায়ী Walking Palm-কে নিশ্চিতভাবে ‘হাঁটতে পারে’ — এমন গাছ বলা যায় না।

