গাছ কি পাশের গাছের DNA ‘চিনতে’ পারে? বিজ্ঞানীদের চোখ এখন সেই রহস্যে

- Advertisement -

নিজেদের চারপাশের গাছপালা সম্পর্কে কি উদ্ভিদেরও কোনও ধারণা থাকে? পাশের গাছটি তার আত্মীয়, নাকি সম্পূর্ণ অপরিচিত — সেটি কি কোনওভাবে বুঝতে পারে একটি গাছ? দীর্ঘদিন ধরে এই প্রশ্নটি উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। এবার সেই রহস্যের আরও গভীরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন ফ্রান্সের একদল গবেষক।

গাছ কি পাশের গাছের DNA ‘চিনতে’ পারে? বিজ্ঞানীদের চোখ এখন সেই রহস্যে

গাছকে আমরা সাধারণত স্থির ও নীরব জীব হিসেবেই দেখি। তারা হাঁটতে পারে না, প্রাণীদের মতো স্নায়ুতন্ত্রও নেই। কিন্তু পরিবেশের পরিবর্তন সম্পর্কে উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া যে অত্যন্ত জটিল, তা বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই জানেন। আলো, জল, মাটির উপাদান, তাপমাত্রা কিংবা পোকামাকড়ের আক্রমণ — বিভিন্ন সংকেতের ভিত্তিতে উদ্ভিদ নিজেদের বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বদলে নিতে পারে।

এবার বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন, শুধু পরিবেশ নয়, পাশে থাকা অন্য উদ্ভিদের জিনগত পরিচয়ও কি কোনওভাবে শনাক্ত করতে পারে গাছ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন গবেষণা প্রকল্প শুরু করতে চলেছেন ফ্রান্সের INRAE-এর উদ্ভিদবিজ্ঞানী Germain Montazeaud। তাঁর পাঁচ বছরের PHYTOPOGON প্রকল্প European Research Council বা ERC-এর Starting Grant পেয়েছে। প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ ইউরো। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হল, কোনও উদ্ভিদ তার প্রতিবেশী উদ্ভিদের জিনগত পরিচয় শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী তাদের সঙ্গে নিজের মিথস্ক্রিয়া বদলায় কি না, তা পরীক্ষা করা।

‘চেনা’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা?

এখানে ‘চেনা’ শব্দটি শুনে মানুষের মতো সচেতনভাবে অন্য গাছকে শনাক্ত করার ধারণা করা ঠিক হবে না। বিজ্ঞানীরা বরং জানতে চাইছেন, উদ্ভিদের জৈবিক ব্যবস্থা কি পাশের গাছ থেকে পাওয়া কোনও সংকেতের মাধ্যমে তার জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে।

এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে কিছু উদ্ভিদ কাছাকাছি থাকা উদ্ভিদের জিনগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কাছের উদ্ভিদ যদি জিনগতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে কোনও কোনও পরিস্থিতিতে শিকড়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা কম হতে পারে। আবার প্রতিবেশী উদ্ভিদে তৃণভোজী প্রাণীর আক্রমণ হলে রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে কাছের উদ্ভিদও সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

তবে এই ধরনের ফলাফল নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে। কারণ ঠিক কোন জিন বা কোন আণবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এমন ‘পরিচয় শনাক্তকরণ’ সম্ভব হয়, তা এখনও পরিষ্কার নয়।

রহস্যের কেন্দ্রে ‘Green Beard’ তত্ত্ব

নতুন গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ‘green beard’ effect বা ‘সবুজ দাড়ি’ তত্ত্ব। এই ধারণাটি বিবর্তনবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত। সহজ ভাষায়, কোনও নির্দিষ্ট জিন বা জিনের একটি বিশেষ সংস্করণ একই সঙ্গে তিনটি কাজ করতে পারে — নিজের একটি শনাক্তযোগ্য সংকেত তৈরি করা, অন্য জীবের মধ্যে সেই সংকেত শনাক্ত করা এবং একই বৈশিষ্ট্য বহনকারী জীবের প্রতি বিশেষ আচরণ করা।

অর্থাৎ কোনও জীবের পুরো জিনোমে কতটা মিল রয়েছে, তা না দেখেও একটি নির্দিষ্ট জিনের সংস্করণ যেন ‘নিজের মতো’ অন্য সদস্যকে শনাক্ত করতে পারে।

এ ধরনের প্রক্রিয়ার উদাহরণ অণুজীব এবং কিছু প্রাণীর মধ্যে পাওয়া গেছে। পিঁপড়ের কিছু প্রজাতি নিয়েও এমন গবেষণা হয়েছে। কিন্তু উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ‘green beard’ gene শনাক্ত হয়নি। Montazeaud-এর PHYTOPOGON প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হল উদ্ভিদে এমন কোনও জিনগত প্রক্রিয়া আদৌ রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা।

হাজার জিনগত বৈচিত্র্যের উদ্ভিদ নিয়ে পরীক্ষা

গবেষণাটি করা হবে Arabidopsis thaliana নামের একটি বহুল ব্যবহৃত মডেল উদ্ভিদকে কেন্দ্র করে। উদ্ভিদবিজ্ঞানে এই ছোট উদ্ভিদটির গুরুত্ব অনেক, কারণ এর জিনোম সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বিপুল তথ্য রয়েছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য জিনগত বৈচিত্র্যের নমুনাও সংরক্ষিত রয়েছে।

গবেষকরা প্রায় ১,০০০টি আলাদা genotype নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে কয়েক হাজার জোড়া তৈরি করে দেখা হবে, কোন জিনগত পার্থক্য বা মিল প্রতিবেশী উদ্ভিদের পারস্পরিক আচরণকে প্রভাবিত করে।

গবেষণায় শুধু গাছের বাহ্যিক বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হবে না। উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন অণু এবং জৈবিক সংকেতও বিশ্লেষণ করা হবে। প্রয়োজন হলে CRISPR-Cas9-এর মতো জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্ভাব্য জিনের ভূমিকা পরীক্ষা করা হবে।

গবেষকরা আরও দেখতে চান, কয়েক প্রজন্ম ধরে উদ্ভিদসমাজকে বিকশিত হতে দিলে সংশ্লিষ্ট জিনগুলোর ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচন কী ধরনের প্রভাব ফেলে।

কৃষিতে মিলতে পারে নতুন সম্ভাবনা

এই গবেষণার ফল শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞানের মৌলিক জ্ঞান বাড়াবে এমন নয়; ভবিষ্যতে কৃষিতেও এর ব্যবহার হতে পারে। একই প্রজাতির একাধিক জাতকে পাশাপাশি চাষ করার পদ্ধতি ইতিমধ্যেই কৃষিতে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন জাতের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য থাকলে কোনও রোগজীবাণুর পক্ষে পুরো জমির ফসলকে একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত করা কঠিন হতে পারে।

কিন্তু ভবিষ্যতে যদি গবেষণায় এমন কোনও জিন শনাক্ত হয়, যা প্রতিবেশী উদ্ভিদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করে, তাহলে কৃষিবিজ্ঞানীরা আরও নির্দিষ্টভাবে জাত নির্বাচন করতে পারবেন।

ধরা যাক, দুটি জাত তাদের অধিকাংশ জিনে আলাদা। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট জিনের একই সংস্করণ তারা বহন করছে। যদি দেখা যায় ওই জিনের কারণে তারা পাশাপাশি চাষে ভালো ফলন দেয় বা একে অপরের সঙ্গে কম প্রতিযোগিতা করে, তাহলে সেই জিনকে ভবিষ্যতের ফসল পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘জেনেটিক মার্কার’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

আত্মীয়কে সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ কি মিলবে?

উদ্ভিদে ‘kin recognition’ বা আত্মীয় শনাক্তকরণের ধারণা গত দুই দশকে বেশ কিছু গবেষণার বিষয় হয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভিদ কখনও কখনও ঘনিষ্ঠ জিনগত সম্পর্কযুক্ত প্রতিবেশীর সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে যাতে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম হয়।

তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। এখনও এমন কোনও সার্বজনীন প্রমাণ নেই যে সব উদ্ভিদ তাদের আত্মীয়কে আলাদা করে চিনতে পারে। বিভিন্ন উদ্ভিদে ফলাফলও একরকম নয়।

PHYTOPOGON প্রকল্প তাই প্রচলিত ‘আত্মীয়কে চেনা’ ধারণার পাশাপাশি আরও নির্দিষ্ট একটি প্রশ্ন তুলছে — পুরো জিনগত সম্পর্ক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জিনের সংস্করণ কি প্রতিবেশী উদ্ভিদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? এই পার্থক্যটিই গবেষণাটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

গাছের ‘সামাজিক জীবন’ সম্পর্কে বদলাতে পারে ধারণা

যদি গবেষকরা সত্যিই উদ্ভিদে এমন কোনও ‘green beard’ ধরনের জিন শনাক্ত করতে পারেন, তাহলে উদ্ভিদের সামাজিক আচরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ এর অর্থ হবে, স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্ক ছাড়াও জীবের মধ্যে জিনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত সহযোগিতামূলক বা প্রতিযোগিতামূলক আচরণ বিবর্তিত হতে পারে।

অবশ্য এই মুহূর্তে গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। এখনও প্রমাণ করতে হবে, উদ্ভিদ সত্যিই প্রতিবেশীর নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারে কি না এবং করলে সেই শনাক্তকরণের জৈবিক প্রক্রিয়াটি কী।

গবেষক Montazeaud-এর নেতৃত্বে পাঁচ বছরের PHYTOPOGON প্রকল্প সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবে। গবেষণার প্রথম পর্যায়ে Arabidopsis thaliana ব্যবহার করা হলেও ভবিষ্যতে বিষয়টি বাস্তব কৃষি ফসলেও পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে camelina, Brassica rapa এবং Brassica oleracea-এর মতো উদ্ভিদ রয়েছে। গবেষকরা দেখতে চান, মডেল উদ্ভিদে পাওয়া কোনও সম্ভাব্য প্রক্রিয়া কৃষিজ উদ্ভিদের মধ্যেও দেখা যায় কি না।

তাই আপাতত সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত উত্তর হল — গাছ মানুষ বা প্রাণীর মতো ‘চিনতে’ পারে, এমন প্রমাণ এখনও নেই। কিন্তু উদ্ভিদ প্রতিবেশী সম্পর্কে জৈবিক সংকেত গ্রহণ করে তাদের আচরণ ও বৃদ্ধির ধরন বদলাতে পারে — এমন প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

আর এখন বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন, সেই সংকেতের মধ্যে কি পাশের গাছের জিনগত পরিচয়ও লুকিয়ে থাকতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে শুধু গাছের রহস্যময় জগত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানই বাড়বে না, ভবিষ্যতের আরও উৎপাদনশীল, বৈচিত্র্যময় ও পরিবেশ-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার নকশাতেও নতুন পথ খুলে যেতে পারে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -