ওক গাছের অভিনব কৌশল, তিন দিন দেরিতে পাতা গজিয়েই রক্ষা ৫৫ শতাংশ ক্ষতি

- Advertisement -

গবেষণায় দেখা গেছে, পোকামাকড়ের আক্রমণের পর ওক গাছ পরের বসন্তে প্রায় তিন দিন দেরিতে পাতা মেলে। এতে শুঁয়োপোকার জন্মের সময় ও কচি পাতার আবির্ভাবের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। ফলে খাবারের অভাবে পোকামাকড়ের ক্ষতি প্রায় ৫৫ শতাংশ কমতে পারে। স্যাটেলাইট তথ্যের সাহায্যে দক্ষিণ জার্মানির বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে এই অভিনব প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

ওক গাছের অভিনব কৌশল, তিন দিন দেরিতে পাতা গজিয়েই রক্ষা ৫৫ শতাংশ ক্ষতি

পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচতে গাছ যে শুধু রাসায়নিক প্রতিরক্ষা বা কাঁটার মতো শারীরিক প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করে, এমন ধারণাই এতদিন প্রচলিত ছিল। কিন্তু নতুন এক গবেষণা সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন আনছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পোকামাকড়ের আক্রমণের পর একটি ওক গাছ পরের বছর নিজের পাতাগজানোর সময়ই বদলে ফেলতে পারে। মাত্র কয়েক দিন দেরিতে পাতা মেলে গাছটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যাতে সদ্য জন্মানো শুঁয়োপোকাদের খাবারের অভাব দেখা দেয়।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Ecology & Evolution-এ। গবেষকদের মতে, আগের বছরে পোকামাকড়ের কারণে বেশি পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ওক গাছ পরের বসন্তে গড়ে প্রায় তিন দিন দেরিতে কুঁড়ি মেলে পাতা বের করে। এই সামান্য সময়ের পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে গাছের ওপর পোকামাকড়ের ক্ষতি প্রায় ৫৫ শতাংশ কমাতে পারে।

কীভাবে পোকামাকড়কে এড়ায় গাছ?

বসন্তে গাছের নতুন পাতা যখন বের হয়, তখন সেগুলো নরম, কোমল এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ থাকে। এই সময়টিই অনেক শুঁয়োপোকার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত খাবারের সময়। ফলে অনেক প্রজাতির পতঙ্গের জীবনচক্র এমনভাবে সাজানো যে, বসন্তে গাছের কচি পাতা বের হওয়ার সময়ের কাছাকাছি তাদের লার্ভা বা শুঁয়োপোকা জন্ম নেয়।

কিন্তু আগের বছর কোনও ওক গাছে যদি প্রচুর শুঁয়োপোকার আক্রমণ হয়, পরের বছর সেই গাছ পাতা বের করার সময় পিছিয়ে দেয়। ফলে শুঁয়োপোকা ডিম ফুটে বের হওয়ার পরও গাছের কচি পাতা অনেক সময় কুঁড়ির মধ্যেই থেকে যায়।

অর্থাৎ শুঁয়োপোকার সামনে খাবারের জোগান কমে যায়। গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সময়ের অসামঞ্জস্য বা ‘mismatch’ পোকামাকড়ের বেঁচে থাকা ও গাছের পরবর্তী ক্ষতি — দুটিই কমাতে পারে।

মাত্র তিন দিন, কিন্তু প্রভাব বড়

তিন দিনকে সাধারণভাবে খুব সামান্য সময় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বনাঞ্চলের খাদ্যশৃঙ্খলে এই কয়েক দিনের ব্যবধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুঁয়োপোকার জন্ম এবং গাছের কচি পাতা বের হওয়ার সময় যদি একসঙ্গে না মেলে, তাহলে শুঁয়োপোকাগুলো তাদের সবচেয়ে পছন্দের ও পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই তিন দিনের বিলম্বের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে পোকামাকড়ের কারণে পাতার ক্ষতি প্রায় ৫৫ শতাংশ কমে যায়। গবেষকদের মতে, এই প্রভাব পরজীবী পতঙ্গ বা রোগজীবাণুর মাধ্যমে প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণের প্রভাবের তুলনাতেও উল্লেখযোগ্য ছিল। এমনকি বড় ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণের সময়ও এই প্রতিরক্ষা কৌশল কার্যকর থাকতে দেখা গেছে।

স্যাটেলাইট থেকে ধরা পড়ল গাছের এই আচরণ

এই গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল গবেষকরা শুধু মাটিতে দাঁড়িয়ে গাছ পর্যবেক্ষণ করেননি। তাঁরা মহাকাশ থেকে পাওয়া Sentinel-1 স্যাটেলাইটের রাডার তথ্য ব্যবহার করেছেন।

দক্ষিণ জার্মানির প্রায় ২,৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৬০টি নাতিশীতোষ্ণ ওক-প্রধান বনাঞ্চল নিয়ে পাঁচ বছর ধরে গবেষণা চালানো হয়। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ২৭,৫০০টি ১০×১০ মিটার পিক্সেল বা পর্যবেক্ষণ এলাকার তথ্য ব্যবহার করেন। মোট পর্যবেক্ষণের সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৩৭,৫০০।

স্যাটেলাইটের রাডার প্রযুক্তির বিশেষ সুবিধা হলো, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বনভূমির ছাউনির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। ফলে বিশাল এলাকার বহু গাছের পাতা গজানোর সময়ের পরিবর্তন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।

২০১৯ সালের পোকামাকড়ের আক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ

গবেষণায় ২০১৯ সাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে সময় ওই অঞ্চলে বড় ধরনের spongy moth বা জিপসি মথের আক্রমণ দেখা যায়। বহু ওক গাছের পাতা ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

স্যাটেলাইটের রাডার তথ্যের মাধ্যমে গবেষকরা দেখতে পান, যেসব গাছ ওই সময়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের পরবর্তী বসন্তের পাতা গজানোর সময়েও পরিবর্তন দেখা যায়। অর্থাৎ গাছের আগের বছরের পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং পরের বছরের পাতাগজানোর সময়ের মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন সমীকরণ

গবেষণাটির গুরুত্ব শুধু পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।

উষ্ণতা বাড়ার ফলে বসন্তে অনেক গাছ সাধারণত আগের তুলনায় দ্রুত পাতা মেলতে শুরু করে। কিন্তু নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, পোকামাকড়ের চাপ সেই প্রবণতাকে উল্টো দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থাৎ উষ্ণতা গাছকে দ্রুত পাতা গজাতে উৎসাহিত করছে, আর পোকামাকড়ের আক্রমণ গাছকে পাতা গজানো পিছিয়ে দিতে বাধ্য করছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, আগের দশকের উষ্ণতার কারণে যে পরিমাণ দ্রুত budburst হওয়ার কথা ছিল, আগের বছরের পাতা-খেকো পোকামাকড়ের প্রভাব তার প্রায় তিন দিনের অগ্রগতি বাতিল করে দিতে পারে।

এ কারণে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন কখন সবুজ হয়ে উঠবে, তা অনুমান করার সময় শুধু তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করলে চলবে না। গাছ এবং পোকামাকড়ের পারস্পরিক সম্পর্কও বিবেচনায় নিতে হবে।

গাছ কি তাহলে ‘বুদ্ধি করে’ সিদ্ধান্ত নেয়?

গবেষকরা অবশ্য গাছের এই আচরণকে মানুষের মতো সচেতন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি উদ্ভিদের পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া ও অভিযোজনের অংশ। আগের বছরের ক্ষতির সঙ্গে পরের বছরের বৃদ্ধির সময়ের যে সম্পর্ক দেখা গেছে, তা গাছের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি নতুন মাত্রা সামনে এনেছে।

এই কৌশলের আরও একটি সুবিধা হল — এটি স্থায়ী নয়। পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হলে গাছ পরের বছর পাতা গজানো পিছিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ পরিস্থিতি বদলালে গাছের এই সময়-নির্ভর প্রতিরক্ষাও বদলাতে পারে।

বন গবেষণায় নতুন দিগন্ত

নতুন গবেষণাটি উদ্ভিদবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—গাছের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি শুধু পাতার রাসায়নিক গঠন বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি সময় নিয়ন্ত্রণও একটি প্রতিরক্ষা কৌশল?

ওক গাছের এই ঘটনা দ্বিতীয় সম্ভাবনার পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ দিচ্ছে। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার দেখাচ্ছে, বনাঞ্চলের ক্ষুদ্র পরিবর্তনও এখন বৃহৎ পরিসরে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

বিজ্ঞানীদের কাছে তাই এই গবেষণার মূল শিক্ষা শুধু ‘গাছ তিন দিন দেরিতে পাতা গজায়’ নয়। বরং গাছের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা জটিল, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে সেই সম্পর্ক বোঝা কেন জরুরি — এই গবেষণা তারই নতুন উদাহরণ।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -