Moon Base : চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনায় NASA চাইছে ISRO-কে

- Advertisement -

মহাকাশ গবেষণায় নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে দীর্ঘমেয়াদি মানব উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ‘Moon Base’ তৈরির পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA। আর এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ISRO-কে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে NASA। ফলে ভবিষ্যতের চন্দ্র গবেষণায় ভারতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Moon Base : চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনায় NASA চাইছে ISRO-কে
Symbolic Image : Moon Base on the lunar south pole.

চাঁদে মানুষের উপস্থিতি নতুন কোনও ঘটনা নয়। ১৯৬৯ সালে Apollo 11 অভিযানের মাধ্যমে মানুষ প্রথমবার চাঁদের মাটিতে পা রাখে। এরপর আরও কয়েকটি Apollo অভিযানে মহাকাশচারীরা চাঁদে গিয়েছেন। তবে সেই অভিযানগুলির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প সময়ের জন্য গিয়ে গবেষণা চালিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসা। এবার সেই ধারণা বদলে দিতে চাইছে NASA। লক্ষ্য শুধু চাঁদে আবার মানুষ পাঠানো নয়, বরং সেখানে এমন একটি অবকাঠামো তৈরি করা, যেখানে মহাকাশচারীরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে গবেষণা ও প্রযুক্তি পরীক্ষা করতে পারবেন।

কী এই Moon Base?

NASA-র পরিকল্পিত Moon Base হল চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদি মানব ঘাঁটি। এটি কোনও একদিনে তৈরি হওয়া একটি বিশাল ভবন হবে না। বরং বিভিন্ন রোবোটিক মিশন, ল্যান্ডার, রোভার, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কার্গো পরিবহন এবং আবাসন প্রযুক্তি ধাপে ধাপে সেখানে পৌঁছে দেওয়া হবে।

NASA জানিয়েছে, Moon Base তৈরির ক্ষেত্রে তাদের পরিকল্পনা তিনটি পর্যায়ে এগোবে। প্রথম পর্যায়ে প্রযুক্তি পরীক্ষা, রোবোটিক মিশন এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে চাঁদের পরিবেশ সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। সবশেষে সেই অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষের বসবাস ও গবেষণার ব্যবস্থা তৈরি করা হবে।

কেন চাঁদের দক্ষিণ মেরু?

Moon Base-এর জন্য দক্ষিণ মেরু বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কারণ। এই অঞ্চলের কিছু গভীর গর্তে এমন এলাকা রয়েছে যেখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই স্থায়ী ছায়াযুক্ত অঞ্চলে জলবরফ থাকতে পারে।

চাঁদের জলবরফ ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। বরফ থেকে জল সংগ্রহ করা গেলে তা পানীয় জল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি অক্সিজেন উৎপাদনেও কাজে লাগানো সম্ভব। আরও উন্নত প্রযুক্তিতে জল থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করে রকেটের জ্বালানি তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।

অর্থাৎ, পৃথিবী থেকে প্রতিটি প্রয়োজনীয় জিনিস চাঁদে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে চাঁদের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালানো সম্ভব হতে পারে। মহাকাশ গবেষণায় এই ধারণাকে বলা হয় In-Situ Resource Utilization বা ISRU।

সূর্যের আলোও বড় সম্পদ

দক্ষিণ মেরুর আরেকটি সুবিধা হল, কিছু উঁচু এলাকায় তুলনামূলক দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো পাওয়া যায়। ফলে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

একদিকে ছায়ায় থাকা অঞ্চলে জলবরফের সম্ভাবনা, অন্যদিকে আলো পাওয়া এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ — এই দুই বৈশিষ্ট্যই দক্ষিণ মেরুকে দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্র ঘাঁটির জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তবে অঞ্চলটি সহজ নয়। দক্ষিণ মেরুর ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত দুর্গম এবং সেখানে আলো ও তাপমাত্রার পরিস্থিতি পৃথিবীর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে সেখানে অবকাঠামো স্থাপন করতে নতুন ধরনের রোভার, শক্তিশালী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।

NASA-র সঙ্গে ISRO-র নতুন সহযোগিতা

এই পরিকল্পনায় ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর এসেছে ২০২৬ সালের আগস্টে। বেঙ্গালুরুতে ৫ ও ৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত নবম India-US Civil Space Joint Working Group বৈঠকে NASA, ISRO-কে তাদের Moon Base কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।

দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৩ সালে ভারত Artemis Accords-এ যোগ দেয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য চাঁদসহ মহাকাশে ভবিষ্যৎ বেসামরিক অনুসন্ধানের জন্য সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার কিছু সাধারণ নীতি তৈরি করা। বর্তমানে Artemis Accords-এ ৭০টি দেশ যুক্ত হয়েছে।

NASA-র নতুন আমন্ত্রণ সেই সহযোগিতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ — ISRO ইতিমধ্যেই Moon Base-এর নির্দিষ্ট কোনও অংশের দায়িত্ব পেয়েছে, এমন ঘোষণা এখনও হয়নি। ভারতের ঠিক কী ভূমিকা থাকবে, কোন প্রযুক্তি দেওয়া হবে কিংবা কোন মিশনে অংশ নেবে — এসব বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন।

ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

চন্দ্রযাত্রায় ভারতের অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে নজর কেড়েছে। বিশেষ করে Chandrayaan-3 মিশনের মাধ্যমে ভারত চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি সফলভাবে অবতরণ করতে সক্ষম হয়। ফলে দক্ষিণ মেরুতে কাজ করার ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক চন্দ্র অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Moon Base প্রকল্পে অংশ নিলে ভারতের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্র গবেষণা, রোবোটিক প্রযুক্তি, ল্যান্ডার, রোভার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানব মহাকাশযাত্রা সংক্রান্ত নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।

এটি ভারতের নিজস্ব মানব মহাকাশ কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহাকাশ সহযোগিতায় ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Gateway-এর বদলে সরাসরি চাঁদের পৃষ্ঠে জোর

NASA-র Moon Base পরিকল্পনায় সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। আগে Artemis কর্মসূচিতে Gateway নামে চাঁদের কক্ষপথে একটি স্পেস স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা ছিল। ২০২৬ সালে NASA চাঁদের পৃষ্ঠে দীর্ঘমেয়াদি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর দিকে বেশি জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং Gateway পরিকল্পনাকে বর্তমান রূপে স্থগিত রেখে কিছু প্রযুক্তি নতুনভাবে ব্যবহারের পথ বেছে নিয়েছে।

Gateway প্রকল্পের জন্য তৈরি কিছু প্রযুক্তি এখন চাঁদের পৃষ্ঠে অবকাঠামো পরীক্ষায় কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তাপ নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহারিক পরীক্ষা চালানো হবে।

প্রথমে রোবট, তারপর মানুষ

Moon Base তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল — প্রথমেই মানুষকে পাঠিয়ে ঘাঁটি তৈরি করা হবে না। NASA প্রথমে রোবোটিক মিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং প্রযুক্তি পরীক্ষা করতে চাইছে।

রোভার চাঁদের মাটি ও ভূপ্রকৃতি পরীক্ষা করবে। ল্যান্ডার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছে দেবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। পরে ধীরে ধীরে আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

NASA-র পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় বহু পৃথক মিশন যুক্ত হবে। অর্থাৎ Moon Base কোনো একটি মিশনের ফল নয়; এটি বহু বছর ধরে চলা একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি।

চাঁদ থেকে মঙ্গলের পথে

Moon Base-এর গুরুত্ব শুধু চাঁদেই সীমাবদ্ধ নয়। NASA মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্র অভিযান ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করবে।

চাঁদে মানুষকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখার প্রযুক্তি, স্থানীয় সম্পদ থেকে জল ও অক্সিজেন উৎপাদন, মহাকাশ বিকিরণ মোকাবিলা, চাঁদের ধুলো থেকে সুরক্ষা এবং সীমিত সম্পদের মধ্যে জীবনযাপন — এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানে কাজে লাগতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনার সামনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ ও চলাচল কঠিন, তাপমাত্রার পার্থক্য অত্যন্ত বেশি এবং পৃথিবী থেকে সরঞ্জাম পাঠানোর খরচও বিশাল। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে কী হতে পারে?

এই মুহূর্তে Moon Base-কে একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। NASA ধাপে ধাপে রোবোটিক মিশন ও প্রযুক্তি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে চাইছে। একই সময়ে ভারতের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

NASA-র আমন্ত্রণ ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। তবে ISRO-র অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনও স্পষ্ট নয়। তাই এখনই বলা যায় না যে ভারত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নিজস্ব ঘাঁটি তৈরি করছে। বরং বলা যায়, ভারতকে মানবজাতির ভবিষ্যৎ চন্দ্র ঘাঁটি তৈরির আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় অংশ নেওয়ার দরজা খুলে দিয়েছে NASA।

চাঁদে একসময় মানুষ শুধু পা রেখেছিল। এবার লক্ষ্য সেখানে দীর্ঘদিন থাকা। আর সেই যাত্রায় ভারত যদি সক্রিয় অংশীদার হয়, তাহলে Chandrayaan-এর সাফল্যের পর ভারতের মহাকাশ অভিযানের পরবর্তী অধ্যায় আরও উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -