প্রাণঘাতী গাজায় মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘের ভয়াবহ তথ্য

- Advertisement -

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গাজা টানা তৃতীয় বছর মানবিক কর্মীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলাকা। ২০২৫ সালে সেখানে ১৮৬ জন মানবিক কর্মী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে নিহত, আহত বা অপহৃত মানবিক কর্মীর সংখ্যা ৯০৭। বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ত্রাণ ও চিকিৎসাকর্মীদের কাজ ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

প্রাণঘাতী গাজায় মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘের ভয়াবহ তথ্য

যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে মানুষের কাছে খাবার, জল, ওষুধ এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া মানবিক কর্মীদের কাজ। কিন্তু গাজায় সেই কাজই ক্রমশ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজা বিশ্বের মানবিক কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী এলাকায় পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট তথ্যভাণ্ডারের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ৯০৭ জন মানবিক কর্মী নিহত, আহত অথবা অপহৃত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে, নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৮৭। সামগ্রিকভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গাজায় ১৮৬ মানবিক কর্মী নিহত

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে গাজায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই গাজায় ১৮৬ জন মানবিক কর্মী নিহত হয়েছেন। এর ফলে তৃতীয় বছরের মতো গাজা মানবিক কর্মীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাপক বাধার মুখে পড়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিতে গিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা UNRWA জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের অন্তত ৩৯৩ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গাজায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিপদের মাত্রা তুলে ধরে।

কেন এত ঝুঁকির মধ্যে মানবিক কর্মীরা?

গাজার যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিক কর্মীদের ঝুঁকির অন্যতম কারণ হল বিমান হামলা, স্থল অভিযান, গোলাবর্ষণ এবং যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়। অনেক সময় ত্রাণ ও চিকিৎসা বহনকারী গাড়ি বা জরুরি সেবার যানবাহনও সংঘাতের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।

এ ছাড়া গাজার বহু এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, নিরাপদ পথের অভাব এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে ত্রাণকর্মীদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করেছেন, আধুনিক যুদ্ধে কম খরচের ও সহজে ব্যবহারযোগ্য সশস্ত্র ড্রোনের বিস্তার মানবিক কর্মীদের জন্য নতুন ধরনের বিপদ তৈরি করছে। শুধু গাজা নয়, বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার ত্রাণকর্মীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে মানবিক কর্মী, চিকিৎসাকর্মী এবং জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। তাঁদের কাজ হল যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে কোনও পক্ষকে সামরিক সহায়তা দেওয়া নয়; বরং বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

জাতিসংঘের মতে, মানবিক কর্মীদের হত্যা, অপহরণ, আটক বা তাঁদের কাজ বাধাগ্রস্ত করা শুধু মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে না, বরং যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকেও বিপন্ন করে।

১৫ প্যারামেডিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত

মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার মধ্যেই গাজায় কয়েকটি আলোচিত ঘটনার তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

২০২৫ সালের মার্চে রাফাহ এলাকায় ১৫ জন ফিলিস্তিনি জরুরি সেবাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত শুরু করার কথা জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাব ও তাঁর পরিবারের মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে ফৌজদারি তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ওই ঘটনায় শিশুটিকে উদ্ধারে যাওয়া দুই প্যারামেডিকও নিহত হয়েছিলেন।

তবে মানবাধিকার সংগঠন ও নিহতদের স্বজনদের একটি অংশ এই তদন্ত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। তাঁদের বক্তব্য, কেবল অভ্যন্তরীণ তদন্ত যথেষ্ট নয়; স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ

গাজার পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর সংকটের অংশ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা, অপহরণ ও অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ড্রোন হামলা, ত্রাণবাহী বহরে হামলা এবং কর্মীদের ওপর সরাসরি সহিংসতা মানবিক কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলছে।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও মানবিক কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ একজন ত্রাণকর্মী নিহত হলে শুধু একজন মানুষের জীবনই হারায় না — একটি নির্দিষ্ট এলাকার বহু মানুষের কাছে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর সক্ষমতাও কমে যায়।

সামনে বড় প্রশ্ন

গাজায় মানবিক কর্মীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যান ক্রমেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে — যুদ্ধের মধ্যে যারা জীবন বাঁচাতে কাজ করছেন, তাঁদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সমস্যাটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তা ক্রমশ বৈশ্বিক মানবিক সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গাজায় টানা তৃতীয় বছরেও মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক মহলের ওপর মানবিক কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার চাপ আরও বাড়ছে।

মানবিক সংস্থাগুলোর কাছে নিরাপদে কাজ করার সুযোগ না থাকলে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই গাজায় শুধু যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগই নয়, মানবিক কর্মী, চিকিৎসাকর্মী এবং ত্রাণবাহী ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যতম জরুরি দায়িত্ব।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -