পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক ব্যবহারে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। দুই গোষ্ঠীকেই নতুন নাম ও প্রতীকের জন্য তিনটি করে বিকল্প জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। দলের বৈধ প্রতিনিধিত্ব ও প্রতীক নিয়ে বিরোধের পরবর্তী শুনানির পর কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মোড়। দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে দুই গোষ্ঠীর বিরোধের জেরে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং দলের সংরক্ষিত ‘জোড়া ঘাসফুল’ বা ‘Flowers & Grass’ প্রতীক আপাতত ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা অন্তর্বর্তী নির্দেশে কমিশন জানিয়েছে, আসন্ন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে তৃণমূলের কোনও গোষ্ঠীই আপাতত দলের পুরনো নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
কমিশনের এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীই নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ প্রতিনিধি বলে দাবি করছে। একদিকে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন বিরোধী গোষ্ঠী বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে নির্বাচন কমিশনের কাছে নথিপত্র ও বক্তব্য পেশ করেছে।
উপনির্বাচনের আগে কেন এমন সিদ্ধান্ত?
আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। দুই গোষ্ঠীই ইতিমধ্যে প্রার্থী দিয়েছে এবং তৃণমূলের নাম ও প্রতীক ব্যবহারের দাবি জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের সামনে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় — কোন গোষ্ঠীকে তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং দলের সংরক্ষিত প্রতীক কে ব্যবহার করবে।
কমিশন জানিয়েছে, এই বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য Election Symbols (Reservation and Allotment) Order, 1968-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তবে উপনির্বাচন সামনে থাকায় সেই পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য সময় সীমিত। ফলে আপাতত দুই পক্ষকে সমান অবস্থানে রাখার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নতুন নাম ও প্রতীক বেছে নিতে হবে দুই গোষ্ঠীকেই
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, দুই পক্ষকে নিজেদের জন্য তিনটি করে সম্ভাব্য দলের নাম জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি করে ‘ফ্রি সিম্বল’ বা কমিশনের নির্ধারিত অবণ্টিত প্রতীকের তালিকা থেকে পছন্দ জানাতে বলা হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার মধ্যে এই পছন্দ জমা দেওয়ার নির্দেশ ছিল। এরপর কমিশন প্রত্যেক গোষ্ঠীর জন্য একটি করে নাম ও প্রতীক অনুমোদন করবে।
অর্থাৎ, আসন্ন উপনির্বাচনে ভোটাররা ইভিএমে ‘All India Trinamool Congress’ নাম এবং পরিচিত জোড়া ঘাসফুল প্রতীক দেখতে পাবেন না — অন্তত কমিশনের বর্তমান অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায়। দুই গোষ্ঠীকেই আলাদা নাম ও প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।
কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি
তবে এই সিদ্ধান্তকে তৃণমূলের নাম বা প্রতীক স্থায়ীভাবে বাতিল হিসেবে দেখছে না নির্বাচন কমিশন। এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। দুই গোষ্ঠীর দাবি, সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র খতিয়ে দেখার পর কমিশন পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
নির্বাচন কমিশনের সামনে মূলত দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধ প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি রয়েছে। দুই পক্ষই নিজেদের দাবির পক্ষে আলাদা নথি পেশ করেছে। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কমিশনকে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও দাবিগুলি পর্যালোচনা করতে হবে।
দুই শিবিরের প্রতিক্রিয়া
কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশের পর দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়াতেও স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির কমিশনের আদেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তাঁদের মতে আদেশটিতে আইনি অসঙ্গতি রয়েছে এবং তাঁরা এর বিরোধিতা করছেন। একই সঙ্গে কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বিরোধী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে। ওই শিবিরের নেতা আখরুজ্জামান আনসারি জানিয়েছেন, তাঁরা কমিশনের নির্দেশ মেনে চলবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে দলের আসল নাম ও প্রতীক ফিরে পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।
নজর এখন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে। দুই গোষ্ঠীকে এখন নতুন পরিচয় ও প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নামতে হবে। প্রার্থী, প্রচার এবং ভোটারদের কাছে নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কতদিন থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের নাম ও জোড়া ঘাসফুল প্রতীক কোন গোষ্ঠীর হাতে থাকবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। ফলে এখন নজর রয়েছে কমিশনের পরবর্তী শুনানি ও রায়ের দিকে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে নির্বাচন কমিশনের এই অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক পরিবর্তন এনেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তৃণমূলের নাম ও প্রতীকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।

