পশ্চিমবঙ্গে ২০২৭ সালের জনগণনার প্রথম ধাপের হাউসলিস্টিং ও হাউজিং সেনসাসের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে। রাজ্যের ১,৭৩,০৬৬টি হাউসলিস্টিং ব্লকে কয়েক কোটি বাড়ি নথিভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটার তালিকার SIR প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনগণনা ও ভোটার তালিকা সংশোধন সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। নাগরিকদের নিজেদের ভোটার তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের পরিষেবা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে ২০২৭ সালের জনগণনার প্রস্তুতিপর্বে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। রাজ্যে ১৬তম জনগণনার প্রথম ধাপের হাউসলিস্টিং ও হাউজিং সেনসাসের মাঠপর্যায়ের কাজ নির্ধারিত সময়সীমার আগেই সম্পূর্ণ হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। রাজ্যের সমস্ত হাউসলিস্টিং ব্লকে এই কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কয়েক কোটিরও বেশি বাড়ি ও আবাসন কাঠামো নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই সাফল্যের পাশাপাশি ভোটার তালিকার সাম্প্রতিক সংশোধন নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন — জনগণনা এবং ভোটার তালিকার সংশোধন একই প্রক্রিয়া নয়। জনগণনা পরিচালিত হয় দেশের জনসংখ্যা, পরিবার, বাসস্থান ও বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহের জন্য। অন্যদিকে ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং এর উদ্দেশ্য হল যোগ্য ভোটারদের সঠিক তালিকা প্রস্তুত করা।
নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ জনগণনার প্রথম ধাপ
পশ্চিমবঙ্গে জনগণনার প্রথম পর্যায়ের মাঠপর্যায়ের কাজের নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ১৪ সেপ্টেম্বর। তার আগেই রাজ্যে হাউসলিস্টিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। গোটা রাজ্যে ১,৭৩,০৬৬টি Houselisting Block-এ এই কাজ হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩,৬৮,৩০,১৫০টি Census House নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা প্রত্যাশিত পরিবারের প্রায় ৯৯.৭ শতাংশের আওতায় এসেছে।
এই কাজের মাধ্যমে শুধু বাড়ির সংখ্যা গণনা করা হয়নি। কোন এলাকায় কী ধরনের বাড়ি রয়েছে, সেখানে পরিবার বসবাস করছে কি না, আবাসনের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কী — এমন একাধিক তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। জনগণনা দফতরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হাউসলিস্টিংয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হল পরবর্তী জনসংখ্যা গণনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি বা কাঠামো তৈরি করা।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে নতুন অভিজ্ঞতা
এবারের জনগণনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পশ্চিমবঙ্গেও স্ব-গণনা বা Self-Enumeration-এর মাধ্যমে নাগরিকদের নিজেদের তথ্য অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর মাঠপর্যায়ের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই তথ্য যাচাই ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক পরিবার অংশ নেয়। কলকাতাতেও হাউসলিস্টিংয়ের নির্ধারিত পর্ব শেষ হয়েছে। তবে কোনও কোনও জায়গায় কিছু বাড়ি বাদ পড়ে থাকতে পারে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে সেগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ থাকবে।
এবার কী হবে?
হাউসলিস্টিং শেষ হওয়া মানেই জনগণনার পুরো প্রক্রিয়া শেষ নয়। এটি মূলত প্রথম ধাপ। এর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা ও ব্যক্তিগত জনমিতিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এই পর্যায়ে বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষাগত অবস্থা, পেশা-সহ নির্ধারিত বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া থাকবে।
অর্থাৎ, এখন যে কাজ শেষ হয়েছে, তা মূলত বাড়ি ও পরিবারের কাঠামো তৈরি করার প্রস্তুতি। পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের জনসংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জনগণনার পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি হবে।
জনগণনা দফতরের মতে, এই তথ্য ভবিষ্যতে সরকারি পরিকল্পনা, পরিকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও জেলা ও অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই তথ্যের গুরুত্ব যথেষ্ট।
ভোটার তালিকা নিয়ে আলাদা প্রক্রিয়া
অন্যদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে যে SIR বা Special Intensive Revision হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন বিশেষভাবে নাম যাচাই, বাদ পড়া নাম, সংশোধন এবং যোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলিতে নজর দিয়েছে।
SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকায় থাকা তথ্য যাচাই করা হয়। কোনও ভোটারের নাম ভুলভাবে বাদ পড়লে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকে। আবার মৃত ব্যক্তি, স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তি বা একাধিক জায়গায় থাকা নামের মতো বিষয়গুলিও যাচাইয়ের আওতায় আসে।
এখানেই জনগণনা এবং ভোটার তালিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। কোনও ব্যক্তির জনগণনায় তথ্য থাকা মানেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার হয়ে যাবেন না। আবার ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং জনগণনায় কোনও পরিবারের তথ্য থাকা — দুটি পৃথক সরকারি রেকর্ড ও পৃথক উদ্দেশ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়।
সাধারণ মানুষের কী করণীয়?
ভোটার হিসেবে নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজেদের নাম ও তথ্য ভোটার তালিকায় সঠিক রয়েছে কি না তা যাচাই করা। নামের বানান, ঠিকানা, বয়স-সংক্রান্ত তথ্য কিংবা পরিবারের সদস্যদের নামের ক্ষেত্রে কোনও ভুল থাকলে সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত পরিষেবা ব্যবহার করা যায়।
নির্বাচন কমিশনের Citizen Service Portal-এ ভোটার সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিষেবা এবং ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সুবিধা রয়েছে।
অন্যদিকে জনগণনার ক্ষেত্রে কোনও পরিবার যদি হাউসলিস্টিংয়ের সময় বাদ পড়ে থাকে, তাহলে স্থানীয় প্রশাসন বা জনগণনা সংক্রান্ত আধিকারিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করাই জনগণনার মূল উদ্দেশ্য।
কেন এই তথ্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য নির্ভরযোগ্য জনসংখ্যাগত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় কত মানুষ বসবাস করেন, কোন এলাকায় আবাসনের প্রয়োজন বেশি, কোথায় স্কুল-হাসপাতালের চাহিদা বেশি, কোন অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা দরকার — এ ধরনের পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে জনগণনার তথ্য ব্যবহৃত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মতো জনবহুল রাজ্যে এই তথ্যের গুরুত্ব আরও বেশি। শহর ও গ্রামের জনসংখ্যার পরিবর্তন, অভিবাসন, আবাসনের ধরন এবং বিভিন্ন মৌলিক পরিষেবার প্রয়োজন বুঝতে জনগণনার তথ্য ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নজরে দুই প্রক্রিয়া
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে এখন দুটি পৃথক প্রক্রিয়া নিয়ে নজর রয়েছে। একদিকে জনগণনার প্রথম ধাপের মাঠপর্যায়ের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে, অন্যদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সংশোধন প্রক্রিয়ার পরবর্তী প্রশাসনিক বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। জনগণনা দেশের জনসংখ্যা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক চিত্র বোঝার জন্য পরিচালিত হয়, আর ভোটার তালিকার সংশোধনের মূল লক্ষ্য হল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিকদের নির্ভুল তালিকা নিশ্চিত করা।
আগামী দিনে জনগণনার পরবর্তী পর্যায়ের কাজ এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ — দুই ক্ষেত্রেই নতুন আপডেট সামনে আসতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করা এবং নিজেদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সঠিক রাখা।

