অশোকনগরে শুরু হয়ে গেল বাণিজ্যিক তেল উৎপাদন, হালদিয়ার পথে প্রথম চালান

- Advertisement -

উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের বাইগাছি তেলক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন শুরু করেছে ONGC। ২৮ আগস্ট প্রথম বাণিজ্যিক চালান হালদিয়া রিফাইনারির উদ্দেশে পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৫-২০ হাজার লিটার তেল উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। আগামী দিনে আরও কয়েকটি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গের জ্বালানি ও শিল্পক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা রয়েছে।

অশোকনগরে শুরু হয়ে গেল বাণিজ্যিক তেল উৎপাদন, হালদিয়ার পথে প্রথম চালান
Symbolic Image : Commercial oil production begins in Ashoknagar, West Bengal.

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের বাইগাছি তেলক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে অপরিশোধিত খনিজ তেল উৎপাদন শুরু করল রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস সংস্থা ONGC। শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রথম বাণিজ্যিক চালান ট্যাঙ্কারে করে হালদিয়া রিফাইনারির উদ্দেশে পাঠানো হয়। এই ঘটনাকে পশ্চিমবঙ্গের জ্বালানি ও শিল্পক্ষেত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অশোকনগরের বাইগাছি এলাকায় প্রায় ২,৩৯৬ মিটার গভীরতায় নতুন কূপ থেকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য অপরিশোধিত তেলের সন্ধান মিলেছে। ONGC-এর নতুন উন্নয়ন কূপ AS-1Z-কে কেন্দ্র করেই বর্তমান উৎপাদন শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, এই কূপটি আগে যেখানে তেলের সন্ধান মিলেছিল, তার কাছাকাছি এলাকায় খনন করা হয়েছে।

হালদিয়ার পথে প্রথম তেল

বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর প্রথম চালানটি বিশেষ ট্যাঙ্কারে করে হালদিয়া রিফাইনারির উদ্দেশে পাঠানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রথম চালানের পরিমাণ নিয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে; একটি প্রতিবেদনে প্রায় ১,২০০ লিটারের কথা বলা হয়েছে। এই চালান মূলত বাণিজ্যিক উৎপাদন ও পরবর্তী শোধন প্রক্রিয়ার সূচনাকে চিহ্নিত করছে।

উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল সরাসরি রিফাইনারিতে পাঠানোর আগে তেল ও জলের মিশ্রণ থেকে জল আলাদা করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এরপর প্রক্রিয়াজাত অপরিশোধিত তেল ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে হালদিয়া রিফাইনারিতে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে তা আরও পরিশোধনের মাধ্যমে বিভিন্ন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য তৈরির কাজে ব্যবহার করা হবে।

দিনে কত তেল উঠবে?

বর্তমানে অশোকনগর তেলক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে। ONGC-এর লক্ষ্য, এই ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার লিটার অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করা। অন্য একটি প্রতিবেদনে বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ২০ ঘনমিটার বা ২০ হাজার লিটার প্রতিদিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

উৎপাদন আরও বাড়াতে আগামী দিনে অশোকনগর এলাকায় অতিরিক্ত কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ONGC অন্তত আরও চার-পাঁচটি কূপ খননের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সংস্থার পক্ষ থেকে অশোকনগরের পাশাপাশি ভুরকুণ্ডা, দৌলতপুর-সহ আশপাশের এলাকাতেও হাইড্রোকার্বনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একদিনে হয়নি এই সাফল্য

অশোকনগরে তেল উৎপাদনের ইতিহাস বেশ কয়েক বছরের পুরনো। ২০১৮ সালে বাইগাছি এলাকায় তেল ও গ্যাসের সন্ধান পায় ONGC। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদনের কাজ শুরু হলেও বিভিন্ন কারণে বাণিজ্যিক উৎপাদন দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়নি।

২০২০ সালে অশোকনগর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে করোনা অতিমারি, জমি সংক্রান্ত সমস্যা এবং কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ বাধার মুখে পড়ে। একটি কূপের উৎপাদন সংক্রান্ত সমস্যাও প্রকল্পের অগ্রগতিকে প্রভাবিত করেছিল।

দীর্ঘ সময় ধরে পরিকাঠামোগত ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলি কাটিয়ে ফের কাজ শুরু করে ONGC। নতুন কূপ খনন এবং তেলের প্রবাহ পরীক্ষা করার পর শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে এগোয় সংস্থা।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে কতটা প্রভাব?

অশোকনগরে বাণিজ্যিক তেল উৎপাদন শুরু হওয়াকে শুধু স্থানীয় ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের স্থলভাগে বাণিজ্যিকভাবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। এবার সেই সম্ভাবনা বাস্তব উৎপাদনে রূপ পেয়েছে।

তবে অশোকনগর থেকে বর্তমানে যে পরিমাণ তেল উৎপাদন হচ্ছে, তা দেশের মোট তেলের চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তাই এই প্রকল্পকে এখনই বড় মাত্রার জ্বালানি স্বনির্ভরতার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর গুরুত্ব রয়েছে ভবিষ্যতের আরও অনুসন্ধান এবং উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরিতে।

ONGC যদি পরবর্তী পর্যায়ের কূপগুলিতে আরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য তেলের সন্ধান পায়, তাহলে অশোকনগর ও বৃহত্তর বঙ্গীয় অববাহিকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন গতি আসতে পারে।

স্থানীয় অর্থনীতিতেও আশার আলো

তেলক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়লে স্থানীয় অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সরাসরি তেল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহণ, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, নির্মাণ ও বিভিন্ন সহায়ক পরিষেবায় কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অশোকনগর এলাকায় ONGC-এর আরও কূপ খনন এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়লে সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তেল উত্তোলনের অপেক্ষায় থাকা এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

বর্তমান পর্যায়ে অশোকনগর তেলক্ষেত্রের উৎপাদন সীমিত হলেও প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল — পরীক্ষামূলক উত্তোলন পেরিয়ে এবার নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎপাদনের সূচনা হয়েছে। সামনে আরও কূপ খনন এবং অনুসন্ধানের ফলের উপর নির্ভর করবে এই তেলক্ষেত্রের প্রকৃত সম্ভাবনা।

প্রথম বাণিজ্যিক চালান হালদিয়ার পথে যাত্রা করার সঙ্গে সঙ্গে অশোকনগর ভারতের তেল ও গ্যাস মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠল। এখন নজর থাকবে, নতুন কূপগুলিতে কতটা তেল পাওয়া যায় এবং আগামী দিনে উৎপাদন কতটা বাড়াতে সক্ষম হয় ONGC।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -