প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরেছেন বাংলাদেশি নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সাহিত্য ও নাগরিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী অধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার, আর ঘটনাটি গণতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে।

প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ বিরতির পর আবার কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন বাংলাদেশি নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি সাহিত্যিক সফর নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, লেখকের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে। দীর্ঘদিন পর কলকাতায় ফিরে আবেগ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি স্বাধীন চিন্তা ও যুক্তিবাদের পক্ষে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন।
তসলিমা নাসরিন ৩১ জুলাই কলকাতায় পৌঁছান। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের আমন্ত্রণে তিনি একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য, মানবাধিকার, নারী-স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁকে ফুল ও শুভেচ্ছার মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। বহু বছর পর পরিচিত শহরে ফিরে তিনি আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং বলেন, কলকাতা তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি শহর নয়, বরং মানসিকভাবে একটি আপন ঠিকানা।
তসলিমার এই সফর বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ ২০০৭ সালের পর এই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে কলকাতায় এলেন। প্রায় ১৯ বছর আগে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার মধ্যে তাঁকে শহর ছেড়ে যেতে হয়েছিল। সেই সময় তাঁর লেখাকে কেন্দ্র করে একাধিক মৌলবাদী সংগঠন বিক্ষোভে নামে। কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে তাঁকে কলকাতা থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি ভারতের বাইরে এবং পরে দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে তসলিমা নাসরিনকে ‘বিতাড়িত’ করা হয়েছিল — এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে আলোচিত। তবে প্রশাসনিক নথিতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এমন তথ্য নেই। সে সময়ের পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা এবং জনশৃঙ্খলার বিষয়টি সামনে রেখে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়। অন্যদিকে তসলিমা বারবার দাবি করেছেন, মৌলবাদী গোষ্ঠীর চাপের কাছে প্রশাসন নতি স্বীকার করেছিল এবং কার্যত তাঁকে শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই ঘটনাকে ঘিরে আজও রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে ভিন্নমত রয়েছে।
কলকাতায় ফিরে সাম্প্রতিক বক্তব্যে তসলিমা নাসরিন বলেন, অন্যায় কখনও স্থায়ী হতে পারে না। দীর্ঘদিন পর এই শহরে ফিরতে পেরে তিনি আনন্দিত এবং আবেগাপ্লুত। তাঁর মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি। ধর্ম, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র — যে কোনও বিষয় নিয়েই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তোলার অধিকার থাকা উচিত। তিনি আরও বলেন, সমালোচনা মানেই বিদ্বেষ নয়; বরং আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়েই সমাজ কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি নারী অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর দাবি, লেখক বা বুদ্ধিজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা দেখানো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তাঁর প্রত্যাবর্তনকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন, আবার সমালোচকদের একাংশের মতে, তাঁর লেখালেখি অতীতের মতো ভবিষ্যতেও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তসলিমা নাসরিনের এই সফর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার এবং যে কোনও নাগরিক বা অতিথির নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। এই মন্তব্যকে অনেকেই ২০০৭ সালের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা করে দেখছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তসলিমা নাসরিনের কলকাতা সফর শুধুমাত্র একটি সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও একটি প্রতীকী দৃষ্টান্ত। প্রায় দুই দশক আগে যে পরিস্থিতির কারণে তাঁকে শহর ছাড়তে হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন বার্তা দিতে চেয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, এই বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তসলিমা নাসরিনের জীবন ও সাহিত্য বরাবরই বিতর্ক এবং সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা, নারী-স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর অবস্থানের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে হুমকি ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়ার পর ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের বিভিন্ন শহরে তাঁকে বসবাস করতে হয়েছে। কলকাতায় দীর্ঘ সময় থাকার কারণে এই শহরের সঙ্গে তাঁর একটি আবেগঘন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাই বহু বছর পর আবার কলকাতায় ফিরে আসা তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে — গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কোথায়? একদিকে সংবিধান নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সম্প্রীতি ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বও রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তসলিমার কলকাতা সফর নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই তাঁর প্রত্যাবর্তনকে স্বাধীন চিন্তা ও মানবাধিকারের পক্ষে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কোনও লেখককে তাঁর মতামতের কারণে ভয় বা সহিংসতার মুখে পড়তে হওয়া উচিত নয়। আবার অন্য একটি অংশের মত, অতীতের বিতর্কিত বিষয়গুলো নতুন করে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ফলে প্রশাসনের দায়িত্ব হবে পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা।
সাহিত্য মহলের একাংশের মতে, লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তার জবাব হওয়া উচিত যুক্তি, আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে — হুমকি বা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে মতের অমিল স্বাভাবিক, তবে সেই মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তসলিমা নাসরিনের এই সফর ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তচিন্তা নিয়ে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে এটি প্রশাসনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে দেখানো যায়, সেটিও নজরে থাকবে।
সব মিলিয়ে, প্রায় ১৯ বছর পর তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ব্যক্তিগত সফর নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, লেখকের নিরাপত্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করেছে। আগামী দিনে তাঁর আরও কর্মসূচি, বক্তব্য এবং এই সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

