পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, টাকার দুর্বলতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপে ভারতীয় শেয়ার বাজারে সতর্কতা বাড়ছে। Sensex ও Nifty সাম্প্রতিক সেশনে দুর্বল হয়েছে। যদিও দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারকে কিছুটা সমর্থন দিচ্ছেন, তবু তেলের দাম, FPI প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধিই আগামী দিনে ভারতীয় শেয়ার বাজারের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

ভারতের শেয়ার বাজারে ফের বাড়ছে উদ্বেগ। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, টাকার দুর্বলতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতা — এই একাধিক কারণ একসঙ্গে ভারতীয় বাজারের উপর চাপ তৈরি করেছে। মঙ্গলবারের লেনদেনে Sensex ও Nifty দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বুধবার বাজার খোলার আগেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না।
৮ সেপ্টেম্বরের লেনদেন শেষে BSE Sensex ৫৫৫.২৩ পয়েন্ট বা প্রায় ০.৭৩ শতাংশ কমে ৭৫,৫৭৭.৫৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। অন্যদিকে NSE Nifty 50 কমেছে ১৪৪.০৫ পয়েন্ট বা প্রায় ০.৬১ শতাংশ, সূচকটি ২৩,৬৩৫.১০ পয়েন্টে বন্ধ হয়। গত সাতটি ট্রেডিং সেশনের হিসাবে দুই প্রধান সূচকই প্রায় ২.২ শতাংশ করে হারিয়েছে। মঙ্গলবারের শেষে উভয় সূচকই ১২ জুনের পর সবচেয়ে নিচু স্তরের কাছাকাছি চলে যায়।
বাজারে চাপের প্রধান কারণ কী?
এই মুহূর্তে ভারতীয় শেয়ার বাজারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল অপরিশোধিত তেলের দাম। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার খবরের মধ্যে Brent crude-এর দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বুধবার সকালে Brent প্রায় ৯৯.৫ ডলারের আশেপাশে ছিল।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি খরচও বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়তে পারে বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপর। একই সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ভারতীয় মুদ্রার উপরও চাপ তৈরি হয়।
তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলবার ভারতীয় টাকা ডলারের তুলনায় প্রায় ৩৩ পয়সা দুর্বল হয়ে ৯৪.৮১ টাকা প্রতি ডলারে নেমেছে। বুধবারও টাকার উপর চাপ বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চস্তরে থাকে, তাহলে আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রিও বড় চিন্তার কারণ
ভারতীয় শেয়ার বাজারে সাম্প্রতিক দুর্বলতার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের বা FPI-দের বিক্রির প্রবণতা। মঙ্গলবার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১২৩ কোটি টাকার ভারতীয় শেয়ার বিক্রি করেছেন। সেপ্টেম্বর মাসে এখনও পর্যন্ত তাঁদের মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১.৩৩ বিলিয়ন ডলার বলে Reuters-এর তথ্য জানিয়েছে।
আরও বড় বিষয় হল, জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারে প্রায় ৬.৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ছয়টি ট্রেডিং সেশনের মধ্যে পাঁচটিতে তাঁরা প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছেন। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারে বন্ডের ইল্ড বৃদ্ধিকে এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা emerging market থেকে টাকা তুলে নিলে শেয়ার বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হওয়ায় FPI প্রবাহের দিকে এখন বিশেষ নজর রাখছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।
মার্কিন সুদের হার নিয়েও উদ্বেগ
শুধু তেল বা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যও ভারতীয় বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত হতে যাওয়া মার্কিন inflation data-এর দিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নজর রয়েছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন Federal Reserve-এর পরবর্তী সুদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বাজারে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। মার্কিন সুদের হার বেশি থাকলে ডলার ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে emerging market-এ বিদেশি অর্থপ্রবাহ কমার আশঙ্কা তৈরি হয়।
দেশীয় বিনিয়োগকারীরা কিছুটা ভরসা দিচ্ছেন
তবে বাজারের ছবিটা পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির বিপরীতে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বা DII-রা বাজারে কিছুটা সমর্থন দিচ্ছেন। ৮ সেপ্টেম্বর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির বিপরীতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলি প্রায় ১,৩৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে বলে বাজার-তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রবাহ বাজারে বড় ধরনের পতন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগের চাপ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং একই সঙ্গে তেলের দামও উচ্চস্তরে থাকে, তাহলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের এই সমর্থন কতটা কার্যকর হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সামনে কোন দিকে নজর বাজারের?
বর্তমানে Nifty-র ক্ষেত্রে ২৩,৬০০-এর আশেপাশের অঞ্চল বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রযুক্তিগত বিশ্লেষকরা। এই স্তর ধরে রাখতে না পারলে আরও বিক্রির চাপ দেখা দিতে পারে। বিপরীতে, সূচক যদি আবার ২৩,৮০০-এর উপরে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে, তাহলে বাজারে সাময়িক স্বস্তি ফিরতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগত স্তরের পাশাপাশি বাজারের গতিপথ নির্ধারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তিনটি বিষয় — Brent crude-এর দাম, ভারতীয় টাকার গতিবিধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কেনাবেচা।
বড় পতন নাকি সাময়িক সংশোধন?
বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি বড় শেয়ার বাজার ধস বলা এখনও ঠিক হবে না। তবে ঝুঁকির মাত্রা যে বেড়েছে, তা স্পষ্ট। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দ্রুত না কমলে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের আশেপাশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে ভারতীয় অর্থনীতির উপর চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে তেলের দাম কমতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবও দ্রুত বদলাতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে বাজারে আবার স্বস্তির র্যালি দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে, এই মুহূর্তে ভারতীয় শেয়ার বাজারে আক্রমণাত্মক কেনাকাটার বদলে সতর্কতার পরিবেশই বেশি স্পষ্ট। আগামী কয়েকটি ট্রেডিং সেশনে তেলের দাম, ডলারের তুলনায় টাকার অবস্থান, FPI প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপথই Nifty ও Sensex-এর পরবর্তী দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

