গোটা দেশে বর্ষার ঘাটতিতে রবি ফসল চাষে আশঙ্কা, প্রভাব পড়তে পারে গম-ডালে

- Advertisement -

বর্ষার শেষ পর্যায়ে বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে কৃষি মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে কম বৃষ্টি হলে মাটির আর্দ্রতা কমে রবি ফসলের বপন ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। গম, সর্ষে, ছোলা ও ডালের মতো ফসল বিশেষভাবে নজরে রয়েছে। জলাধারে কম জল জমলে সেচের চাপও বাড়বে। আগামী কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টিপাতই পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গোটা দেশে বর্ষার ঘাটতিতে রবি ফসল চাষে আশঙ্কা, প্রভাব পড়তে পারে গম-ডালে

বর্ষার শেষ পর্যায়ে বৃষ্টির দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কৃষি মহলে। চলতি বর্ষা মরশুমে বৃষ্টির ঘাটতির প্রভাব ইতিমধ্যেই খরিফ ফসলের চাষে দেখা যাচ্ছে। এবার সেই ঘাটতি যদি সেপ্টেম্বরেও বজায় থাকে, তাহলে সামনে থাকা রবি মরশুমের চাষ এবং উৎপাদন নিয়েও ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রবি ফসলের জন্য বর্ষার শেষ দিকের বৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়ের বৃষ্টিই মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা তৈরি করে এবং বহু এলাকায় পরবর্তী মরশুমের সেচের জলের জোগান নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

আর্থিক বিশ্লেষণ সংস্থা Crisil-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগস্টে বৃষ্টিপাতের গতি ফের দুর্বল হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও ঘাটতি থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি আসন্ন রবি মরশুমের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যে সমস্ত এলাকায় সেচের সুবিধা সীমিত, সেখানে মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে রবি ফসলের বপন এবং পরবর্তী ফলন দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রবি ফসলের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ বর্ষার শেষ বৃষ্টি?

ভারতে রবি মরশুমের প্রধান ফসলগুলির মধ্যে রয়েছে গম, সর্ষে, ছোলা ও বিভিন্ন ধরনের ডাল। এই ফসলগুলির বপন সাধারণত বর্ষা শেষ হওয়ার পর শুরু হয়। ফলে বর্ষার শেষ দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে জমিতে যে আর্দ্রতা তৈরি হয়, তা অনেক অঞ্চলে রবি চাষের প্রাথমিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শুধু জমির আর্দ্রতাই নয়, বর্ষার বৃষ্টির সঙ্গে দেশের জলাধার, বাঁধ এবং ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণও জড়িত। বর্ষায় পর্যাপ্ত জল না জমলে শীতের মরশুমে সেচের উপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে বৃষ্টিনির্ভর কৃষি অঞ্চলে এই সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

Reuters-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি রবি মরশুমে গম, সর্ষে এবং ছোলার মতো ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় মাটির আর্দ্রতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বর তুলনামূলক শুষ্ক হয়ে গেলে রবি ফসলের বপন এলাকা এবং ফলন — দুটির উপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খরিফ মরশুমেও ইতিমধ্যে প্রভাব

দুর্বল বর্ষণের প্রভাব শুধু ভবিষ্যতের রবি ফসলের উপর সীমাবদ্ধ নয়। চলতি খরিফ মরশুমেও চাষের এলাকায় তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ধানের চাষের এলাকা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ কমে ৪২.১৮ মিলিয়ন হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। কর্ণাটক, তেলঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের মতো কয়েকটি রাজ্যে ধানের জমি কমেছে।

সামগ্রিক খরিফ চাষের এলাকাও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১.৬ শতাংশ কম হয়েছে। একই সময়ে ডালের চাষ কিছুটা বাড়লেও তৈলবীজের এলাকা সামান্য কমেছে। অর্থাৎ বৃষ্টির বণ্টন এবং ঘাটতি কৃষির বিভিন্ন অংশে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে।

কোন কোন রবি ফসল বেশি নজরে?

রবি মরশুমে সবচেয়ে বেশি নজরে থাকবে গম, সর্ষে, ছোলা এবং অন্যান্য ডাল। পাশাপাশি বিভিন্ন তৈলবীজও গুরুত্বপূর্ণ।

গম ভারতের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ফসল। অন্যদিকে সর্ষে ও অন্যান্য তৈলবীজের উৎপাদন কমলে ভোজ্যতেলের আমদানির উপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। ডালের উৎপাদন কম হলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে এখনই কোনও নির্দিষ্ট ফসলের উৎপাদন কতটা কমবে, তা বলা সম্ভব নয়। সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিপাত, অক্টোবর-নভেম্বরে মাটির আর্দ্রতা এবং বপনের সময়কার আবহাওয়া — সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবে।

জলাধারের জল নিয়েও উদ্বেগ

কম বৃষ্টির আর একটি বড় প্রভাব পড়তে পারে জলাধারগুলিতে। রবি চাষে সেচের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই নির্ভর করে স্থানীয় জলসম্পদের উপর। বর্ষার সময় জলাধার যথেষ্ট পরিমাণে পূর্ণ না হলে পরবর্তী মাসগুলিতে কৃষি সেচের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।

কর্ণাটকের মতো কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যেই বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে রাজ্যটির ৩১টি জেলার মধ্যে ৩০টিতেই স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি জেলায় ঘাটতি ৫০ শতাংশেরও বেশি। এই পরিস্থিতি রবি চাষের আগে জলসম্পদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

কিছু জলাধারেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কর্ণাটকের নাভিলুতীর্থ জলাধারের জলস্তর সেপ্টেম্বরের শুরুতে ধারণক্ষমতার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রবি মরশুমে সেচের জলের চাহিদা বাড়লে এই ধরনের পরিস্থিতি কৃষকদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তবে কি দেশজুড়ে একই পরিস্থিতি?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতের সব অঞ্চলে বৃষ্টির পরিস্থিতি এক নয়। কোনও কোনও এলাকায় বৃষ্টির ঘাটতি থাকলেও অন্য অঞ্চলে স্বল্প সময়ে ভারী বা অতিভারী বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে শুধু সর্বভারতীয় গড় বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান দিয়ে কৃষির প্রকৃত পরিস্থিতি বিচার করা কঠিন।

ভারতীয় আবহাওয়া দফতর বা IMD-র পূর্বাভাসেও দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির ধরন আলাদা। একদিকে পূর্ব ভারতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষিণ উপদ্বীপীয় ভারতে তুলনামূলক দুর্বল বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকার কথা জানানো হয়েছে।

অর্থাৎ কৃষির ক্ষেত্রে শুধু কত মিলিমিটার বৃষ্টি হল তা নয়, কোন এলাকায়, কখন এবং কীভাবে বৃষ্টি হল — সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যদামেও কি প্রভাব পড়তে পারে?

রবি ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে তার প্রভাব খাদ্যবাজারেও পড়তে পারে। গম, ডাল বা তৈলবীজের উৎপাদন কম হলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহের চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে আমদানির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।

Reuters-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্বল বর্ষার ফলে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল এবং তুলোর মতো কৃষিপণ্যে উৎপাদন কমলে আমদানির প্রয়োজন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য মূল্যস্ফীতির উপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে এই মুহূর্তে সরাসরি খাদ্যদাম বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া তাড়াহুড়ো হবে। কারণ সরকারের মজুত, বাজারে সরবরাহ এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের আবহাওয়া — সবকিছুই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি

কৃষি বিশেষজ্ঞদের নজর এখন সেপ্টেম্বরের বৃষ্টির দিকে। এই মাসে পর্যাপ্ত এবং সুষম বৃষ্টি হলে মাটির আর্দ্রতা বাড়তে পারে এবং রবি বপনের পরিস্থিতিও কিছুটা অনুকূল হতে পারে। বিপরীতে, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা থাকলে সেচনির্ভরতা বাড়বে এবং বৃষ্টিনির্ভর অঞ্চলে কৃষকদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ — সেপ্টেম্বরের মোট বৃষ্টিপাত, মাটির আর্দ্রতা, জলাধারের জলস্তর এবং রবি ফসলের বপনের এলাকা।

সব মিলিয়ে, দুর্বল বর্ষা এখন শুধু খরিফ ফসলের সমস্যা নয়। বর্ষার শেষ পর্যায়ে বৃষ্টির ঘাটতি বজায় থাকলে তার প্রভাব আগামী রবি মরশুম, কৃষকদের আয় এবং খাদ্য সরবরাহের উপরও পড়তে পারে। তবে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টির প্রকৃত চিত্র এবং রবি বপনের পরিস্থিতি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন কতটা কমবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনও সম্ভব নয়। আপাতত তাই কৃষি অর্থনীতিতে সতর্কতার সংকেত হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -