ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ বাংলাদেশ এবার ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছে। চলতি বছরে উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত দুই মাসে গুজরাট ও হাওড়া থেকে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে গেছে। বিশেষ করে ডিমভরা ইলিশের চাহিদা মেটাতেই এই আমদানি। ঘটনাটি দুই দেশের ইলিশ বাণিজ্যের প্রচলিত সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইলিশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতিও রয়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশের ইলিশের জন্য অপেক্ষা করেন ভারতের মাছ ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে তৈরি হয় আলাদা আগ্রহ। কিন্তু চলতি বছরে সেই চেনা ছবিতেই যেন বদল এসেছে। এবার উল্টো পথে হাঁটছে ইলিশের বাণিজ্য। ভারত থেকে বাংলাদেশে যাচ্ছে ইলিশ।
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, গত দুই মাসে গুজরাট ও হাওড়া থেকে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে। গুজরাটের ভরুচ বন্দর থেকেও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ইলিশ সংগ্রহ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের মাছের বাজারে নতুন করে চর্চার জন্ম দিয়েছে।
কেন ভারত থেকে ইলিশ কিনছে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন যথেষ্ট হলেও প্রতি বছর মাছের জোগান একই রকম থাকে না। চলতি বছরে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে ব্যবসায়ী মহলের বক্তব্য। ফলে দেশের বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশের জোগান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে বড় আকারের এবং ডিমভরা ইলিশের চাহিদা বাংলাদেশের বাজারে যথেষ্ট বেশি। সেই চাহিদা মেটাতেই ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে ইলিশ আমদানির দিকে ঝুঁকেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলে জানা যাচ্ছে।
অর্থাৎ, বিষয়টি এমন নয় যে বাংলাদেশে একেবারেই ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট সময়ে বাজারের চাহিদার তুলনায় জোগান কমে যাওয়াই আমদানির অন্যতম কারণ।
গুজরাটের ইলিশেই কেন আগ্রহ?
বাংলাদেশের আমদানিকারকদের কাছে গুজরাটের ইলিশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হল সেখানে ইলিশের জোগান বৃদ্ধি। বিশেষ করে নর্মদা নদী ও সংলগ্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের উপস্থিতি নজর কেড়েছে।
বাংলাদেশের বাজারে ডিমভরা ইলিশের চাহিদা বেশি। সংশ্লিষ্ট মাছ ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গুজরাটে এই ধরনের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের কাছে গুজরাটের মাছ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
গুজরাটের ভরুচ বন্দর থেকেও ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পাশাপাশি হাওড়ার পাইকারি মাছের বাজার থেকেও বাংলাদেশে ইলিশ গিয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাট — দুই জায়গাই এই আমদানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
প্রায় ৫০০ টন ইলিশের আমদানি
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত দুই মাসে গুজরাট ও হাওড়া মিলিয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে। এই পরিমাণকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ যে দেশ দীর্ঘদিন ধরে ইলিশ উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য পরিচিত, সেই দেশের বাজারে বিদেশি ইলিশের এত বড় চালান পৌঁছনো নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
তবে এটিকে বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। মাছের উৎপাদন বছরে বছরে পরিবর্তিত হয়। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, মাছের আকার, দাম এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে সরবরাহ — সবকিছু মিলিয়েই আমদানির প্রয়োজন তৈরি হতে পারে।
শুধু বাংলাদেশের বাজারেই বিক্রি হচ্ছে না
বাংলাদেশে আমদানি করা ইলিশের ব্যবহার নিয়েও রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যাচ্ছে, আমদানি করা মাছের একটি অংশ প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ইলিশের ডিম আলাদা করে বিক্রির ব্যবস্থাও রয়েছে।
অন্যদিকে কিছু ইলিশ শুকিয়ে বা নোনা ইলিশ হিসেবেও বাজারজাত করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভারতের ইলিশ বাংলাদেশে ঢোকার পর শুধু তাজা মাছ হিসেবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্য সংযোজন এবং পুনঃরপ্তানির সম্ভাবনাও।
তাহলে ভারত কি এবার বাংলাদেশের ইলিশ পাবে না?
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় কৌতূহল। একদিকে বাংলাদেশ ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছে। অন্যদিকে দুর্গাপুজোর আগে ভারতের ব্যবসায়ীরা আবার বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি অনুসরণ করে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারতকে সীমিত পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৫ সালেও দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
২০২৬ সালেও ভারতের মাছ আমদানিকারকদের তরফে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আনার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে চলতি বছরে ভারতকে কতটা ইলিশ দেওয়া হবে, শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীতির উপর নির্ভর করবে।
ইলিশের বাণিজ্যে কি বদল আসছে?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ইলিশের বাণিজ্যে সাম্প্রতিক এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এতদিন সাধারণত যে চিত্রটি দেখা যেত তা হল — বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ আসে। এবার তার পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ যাচ্ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত বাংলাদেশের ইলিশের জায়গা নিয়ে ফেলেছে। বরং বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের সাময়িক ভারসাম্যহীনতার কারণে দুই দেশের মধ্যে ইলিশের বাণিজ্য এখন উভয়মুখী হওয়ার একটি নজির সামনে এসেছে।
গুজরাটে ইলিশের জোগান বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান — এই দুই বিষয় একসঙ্গে কাজ করেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ও জোগান আগামী দিনে স্বাভাবিক হলে ভারত থেকে এই আমদানির প্রয়োজন কতটা থাকবে, সেটিই এখন দেখার। অন্যদিকে গুজরাটে ইলিশের জোগান যদি আগামী দিনেও বেশি থাকে, তাহলে বাংলাদেশের মতো বড় বাজারে রপ্তানির সুযোগ আরও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইলিশের বাণিজ্যে এবার দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত উলটপালট। যে বাংলাদেশের ইলিশের জন্য ভারতের বাজারে এতদিন অপেক্ষা ছিল, সেই বাংলাদেশই এবার ভারতের গুজরাটের ইলিশ কিনছে। প্রায় ৫০০ মেট্রিক টনের এই আমদানি তাই শুধু মাছের বাণিজ্যের খবর নয়; এটি দুই দেশের বাজারে ইলিশের চাহিদা, সরবরাহ এবং উৎপাদনের পরিবর্তিত সমীকরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

