ভারতের শেয়ার বাজারে টানা চতুর্থ দিনের উত্থান অব্যাহত রয়েছে। সোমবার সেনসেক্স ৫৪৪ পয়েন্ট এবং নিফটি ৩৯০ পয়েন্ট বেড়ে উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় বন্ধ হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম কমা, আইটি খাতের শক্তিশালী পারফরম্যান্স, ইতিবাচক কর্পোরেট ফলাফল এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাজারে আশাবাদ বাড়িয়েছে। আগামী দিনে RBI-এর নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বৈশ্বিক বাজারের গতিপ্রকৃতির দিকে নজর থাকবে।

নতুন সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই শক্তিশালী উত্থানের সাক্ষী থাকল ভারতের শেয়ার বাজার। সোমবারের লেনদেনে টানা চতুর্থ দিনের মতো ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রেখে উল্লেখযোগ্য লাভে বাজার বন্ধ হয়েছে। ইতিবাচক বৈশ্বিক সংকেত, অপরিশোধিত তেলের দামের পতন এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলির আশাব্যঞ্জক আর্থিক ফলাফলের প্রভাবে বাজারে ক্রেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে নিফটি ৫০ সূচক পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায় এবং সেনসেক্সও উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় লেনদেন শেষ করে।
দিনের শেষে বিএসই সেনসেক্স ৫৪৪ পয়েন্ট বেড়ে ৭৮,৬৩৯.০৩ পয়েন্টে বন্ধ হয়। অন্যদিকে এনএসই নিফটি ৫০ সূচক ৩৯০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২৪,৭৭৪.৩০ পয়েন্টে পৌঁছায়। টানা চার দিনের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থার সঞ্চার করেছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং কর্পোরেট আয়ের উন্নতির প্রত্যাশা বাজারকে শক্তিশালী ভিত্তি দিচ্ছে।
সোমবারের লেনদেনে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। বেশ কয়েকটি বড় প্রযুক্তি সংস্থার ইতিবাচক আর্থিক ফলাফলের কারণে এই খাতের শেয়ারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ব্যাংকিং, আর্থিক পরিষেবা, অটোমোবাইল, ভোগ্যপণ্য এবং মূলধনী পণ্য খাতেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। ফলে বাজারের উত্থান শুধুমাত্র কয়েকটি বড় কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে।
বাজারের এই ইতিবাচক গতির অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য হ্রাস। ভারতের মতো বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশের জন্য জ্বালানির দাম কমা অর্থনীতির পক্ষে ইতিবাচক বলে মনে করা হয়। এতে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প ও পরিবহন খাতের ব্যয় কমার সম্ভাবনাও তৈরি হয়, যা কর্পোরেট মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
এদিন বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও বাজারকে সমর্থন করেছে। দেশীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার ওপর আস্থা রেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন বড় মূলধনী শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন বলে বাজার মহলের ধারণা। দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও ইতিবাচক অবস্থান বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
বড় মূলধনী সংস্থার পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট মূলধনী কোম্পানির শেয়ারেও ভালো চাহিদা দেখা যায়। মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ সূচকও লাভের মুখ দেখে। এটি প্রমাণ করে যে বাজারে সামগ্রিকভাবে ক্রেতাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন খাতে নতুন সুযোগ খুঁজছেন। দীর্ঘদিন ধরে সীমিত পরিসরে চলা লেনদেনের পর বাজারে এই বিস্তৃত অংশগ্রহণকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সোমবার থেকেই শেয়ার বাজারে সমাপনী মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন ক্লোজিং অকশন সেশন ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দিনের শেষ পর্যায়ের লেনদেন আরও স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে শেষ মুহূর্তে অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামার প্রবণতা কমবে এবং বিনিয়োগকারীরা আরও নির্ভরযোগ্য সমাপনী মূল্য পাবেন।
আগামী কয়েক দিনের দিকে এখন বিনিয়োগকারীদের বিশেষ নজর থাকবে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন বড় কোম্পানির ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর। সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন আগামী দিনের শেয়ার বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি এখনও শক্তিশালী রয়েছে। উৎপাদন, পরিষেবা এবং ভোগ্যপণ্যের চাহিদা স্থিতিশীল থাকায় আগামী দিনেও কর্পোরেট আয়ের উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে সোমবারের লেনদেন ভারতীয় শেয়ার বাজারে ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। টানা চার দিনের উত্থান বাজারে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে এবং দেশীয় অর্থনীতির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দৃঢ় করেছে। আগামী কয়েকটি সেশনে অর্থনৈতিক তথ্য, কর্পোরেট ফলাফল এবং বৈশ্বিক বাজারের গতিবিধি অনুকূলে থাকলে এই ইতিবাচক প্রবণতা আরও কিছুটা সময় বজায় থাকতে পারে বলে বাজার বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

