গ্রাম-বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ, উদ্বেগে পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা

- Advertisement -

গ্রাম-বাংলার খাল, বিল ও জলাশয় থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ। জলাভূমি ধ্বংস, কীটনাশকের ব্যবহার, জলদূষণ, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরা এবং জলবায়ু পরিবর্তন এ সংকটের প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা দেশি মাছ সংরক্ষণে জলাশয় রক্ষা, অভয়াশ্রম গঠন, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, যাতে জীববৈচিত্র্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বজায় থাকে।

গ্রাম-বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ, উদ্বেগে পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা

একসময় গ্রাম-বাংলার খাল, বিল, পুকুর, ডোবা, জলাশয় ও ধানক্ষেত ছিল দেশি মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বর্ষা এলেই শোল, মাগুর, কৈ, ট্যাংরা, পুঁটি, মৌরলা, খলসে, চিংড়ি, গজার, বাইনসহ নানা প্রজাতির মাছ সহজেই ধরা পড়ত। গ্রামের মানুষের খাদ্যতালিকায় এসব মাছ ছিল নিয়মিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন বহু এলাকায় দেশি মাছের দেখা মিলছে খুবই কম। অনেক প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির পথে, আবার কিছু মাছ কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাভূমি সংকুচিত হওয়া, অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার, নদী-খাল ভরাট, জলদূষণ এবং অপরিকল্পিত মাছ ধরার প্রবণতা দেশি মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, যা মাছের প্রজনন ও বেঁচে থাকার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, গ্রামীণ জলাশয় একসময় প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করত। বর্ষার জলে নদী ও খালের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হওয়ায় মাছ সহজেই বিস্তার লাভ করত। কিন্তু এখন অনেক খাল ও বিল ভরাট হয়ে গেছে কিংবা বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে আধুনিক কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাবও উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিক বৃষ্টির জলের সঙ্গে জলাশয়ে গিয়ে মিশে জলের গুণগত মান নষ্ট করছে। এতে মাছের ডিম ও পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্র বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এ প্রবণতা চলতে থাকলে দেশি মাছের বৈচিত্র্য আরও কমে যেতে পারে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রে প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরার কারণে মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। অতি সূক্ষ্ম জালের ব্যবহারও একটি বড় সমস্যা। এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি অসংখ্য পোনা ও ডিমবাহী মাছ ধরা পড়ে, ফলে পরবর্তী প্রজন্মের মাছের সংখ্যা কমে যায়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ছাড়া এই প্রবণতা রোধ করা কঠিন।

দেশি মাছ শুধু খাদ্যের উৎস নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছোট দেশি মাছের মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন এ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও প্রবীণদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে দেশি মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দেশি মাছের সংকট শুধু পরিবেশগত নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগেও বর্ষাকালে সামান্য জাল বা ঝাঁকি ফেললেই নানা ধরনের দেশি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে একই এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও তেমন মাছ পাওয়া যায় না। অনেক তরুণ প্রজন্ম এমন কিছু মাছের নামই জানে না, যেগুলো একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত সম্পদ ছিল।

মৎস্যচাষে বিদেশি ও বাণিজ্যিক প্রজাতির মাছের বিস্তারও দেশি মাছের ওপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে অনেক জলাশয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে দেশি মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশি মাছ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা, খাল ও বিল পুনরুদ্ধার, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ সূক্ষ্ম জালের ব্যবহার বন্ধ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি উৎসাহিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে দেশি মাছ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে জলাশয় পুনরুদ্ধার, মাছের অভয়াশ্রম তৈরি এবং দেশি মাছের পোনা অবমুক্ত করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত আকারে বাস্তবায়ন করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা অনেক দেশি মাছকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

দেশি মাছ শুধু একটি খাদ্যসম্পদ নয়; এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক পরিবেশেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই সম্পদ রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, কৃষক, জেলে ও পরিবেশপ্রেমীদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গ্রাম-বাংলার দেশি মাছের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -