বিদ্রোহের আগুনে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর : অধিকার, শোষণ ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের এক নির্লজ্জ ইতিহাস

- Advertisement -

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) তীব্র গণ-বিক্ষোভ, তীব্র দমনপীড়ন এবং একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই অশান্ত পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সম্প্রতি শুরু হওয়া বিতর্কিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমগ্র অঞ্চলটি এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বিদ্রোহের আগুনে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর : অধিকার, শোষণ ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের এক নির্লজ্জ ইতিহাস

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা তথাকথিত ‘আজাদ কাশ্মীর’ বা পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (PoK) বর্তমানে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ জুলাই ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে এসে আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। রুটি, রুজি, বিদ্যুৎ ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র যে দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, তা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বিক্ষোভের মূল কারণসমূহ

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ রয়েছে –

অর্থনৈতিক শোষণ : স্থানীয় নদী থেকে বিপুল পরিমাণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে পাকিস্তান মূল ভূখণ্ডে নিয়ে গেলেও কাশ্মীরের জনগণকে চড়া বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। আটা, গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহার সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

আসন সংরক্ষণ বিতর্ক (১২টি বিতর্কিত আসন) : বিক্ষোভের প্রধান রাজনৈতিক কারণ হল কাশ্মীরের আইনসভায় এমন ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখা, যা পাকিস্তানের অন্য প্রান্তে বসবাসকারী কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ইসলামাবাদ এই আসনগুলিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সেখানে নিজেদের পছন্দের পুতুল প্রধানমন্ত্রী বসায়।

বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য ও মূল দাবি

‘জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (JKJAAC)-এর নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। আন্দোলনকারীদের প্রধান বক্তব্য ও দাবিগুলি হল –

১. শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত বিতর্কিত ১২টি আসন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

২. স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় মানুষের অধিকার দিতে হবে।

৩. সস্তা বিদ্যুৎ এবং আটার ওপর সরকারি ভর্তুকি পুনরায় চালু করতে হবে।

৪. পাকিস্তান সরকারের অনৈতিক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

পাকিস্তানের দমনমূলক নীতি ও অত্যাচারের কারণ

পাকিস্তান সরকার এই আন্দোলনকে তাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক বিরাট হুমকি হিসেবে দেখছে। বিক্ষোভ দমনের পেছনে ইসলামাবাদের প্রধান কারণগুলি হল –

নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় : এই আন্দোলন যদি সফল হয়, তবে পাক ভূখণ্ডের ওপর গিলগিট-বালতিস্তান বা বেলুচিস্তানের মতো অন্য প্রান্তেও বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার : আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পাকিস্তান সরকার ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (JAAC)-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং সেটিকে একটি ‘সন্ত্রাসবাদী সংগঠন’ হিসেবে তকমা দিয়েছে। তারা দাবি করছে যে এই বিক্ষোভের আড়ালে পাকিস্তানি তালিবান (TTP) এবং ভারতের উসকানি রয়েছে, যাতে তারা নিজেদের নৃশংসতাকে আড়াল করতে পারে।

PoK বাসীর বর্তমান অবস্থান, স্বাধীনতা নাকি ভারতের সঙ্গে ভুক্তি?

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের বর্তমান ক্ষোভ মূলত পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে। বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় তাদের অবস্থান নিম্নরূপ –

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তীব্র অনীহা : কাশ্মীরের মানুষ এখন পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পোড়াচ্ছেন এবং পাকিস্তানি রেঞ্জার্সদের ‘দখলদার বাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন : আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ আপাতত পাকিস্তানের রাজনৈতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবি তুলছে।

ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি : পাকিস্তানের চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের উন্নয়ন দেখে PoK-এর সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। তবে সরাসরি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেয়ে এই মুহূর্তে পাকিস্তানি শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

বর্তমান পরিস্থিতি এবং নিহতের পরিসংখ্যান

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত থমথমে এবং রক্তাক্ত। রাওলাকোট, মুজাফফরাবাদ এবং মীরপুরের মতো প্রধান শহরগুলিতে সেনা ও রেঞ্জার্স মোতায়েন করা হয়েছে।

মৃত্যুর সংখ্যা : জুন ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই চলমান সহিংসতায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৮০ থেকে ৯০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং কয়েকশত মানুষ গুরুতর আহত। শুধুমাত্র গত ২৪ ঘণ্টাতেই রাওয়লাকোটে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ২০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী মারা গেছেন।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা : গোটা অঞ্চলে মোবাইল, ইন্টারনেট পরিষেবা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে, যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো খবর বাইরে আসতে না পারে।

প্রহসনের নির্বাচন ও তার সাফল্য

এই চরম অশান্তির মধ্যেই সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) থেকে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে আইনসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, যা আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত দফায় দফায় চলার কথা। তবে এই নির্বাচন সম্পূর্ণ ব্যর্থ বা ‘প্রহসন’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে –

গণ-বয়কট : সাধারণ মানুষ এবং আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি এই নির্বাচনকে সম্পূর্ণ বয়কট করেছে।

ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতা : প্রথম দফার ভোটেই ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। খোদ পাকিস্তানের সরকারি জোটের শরিক দল ‘পিপিপি’ অভিযোগ করেছে যে নওয়াজ শরিফের দল ‘পিএমএল-এন’-কে জোর করে জেতানো হচ্ছে। বহু জায়গায় ব্যালট বাক্স পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সহিংসতার কারণে কয়েকটি জেলায় ভোট স্থগিত করা হয়েছে। পাকিস্তানি নেতাদের বিতর্কিত বিবৃতি

পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের আপত্তিকর ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য

খাজা আসিফ (পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী) : তিনি প্রকাশ্য দূরদর্শন সাক্ষাৎকারে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোকে সমর্থন করে বলেছেন, “I put the protesters of Azad Kashmir in the same category as India and consider them also as enemies like India.” অর্থাৎ, তিনি আন্দোলনরত কাশ্মীরের নাগরিকদের ভারতের মতো পাকিস্তানের ‘শত্রু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং কোনো আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।

রানা সানাউল্লাহ (প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) : তিনি দাবি করেছেন বিক্ষোভকারীরা জোর করে মুজাফফরাবাদ দখল করতে চাইছে এবং তারা “ভারতের মতো আক্রমণ” চালাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের এই মানবিক সংকট এখন আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছেছে –

ভারতের কড়া অবস্থান : ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট জানিয়েছেন, “…the ongoing mass protests in Pakistan-occupied Jammu and Kashmir are the direct consequences of Pakistan’s economic exploitation, its denial of the people’s fundamental rights, and its administrative oppression,” ভারত বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে এই অত্যাচারের জন্য দায়ী করার আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠন : জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এই বিপুল হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইসলামাবাদকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ অবিলম্বে ইন্টারনেট চালু করার এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ : ব্রিটেন (লন্ডন, ব্র্যাডফোর্ড) এবং আমেরিকার ওয়াশিংটনে প্রবাসী কাশ্মীরি ও মানবাধিকার কর্মীরা পাকিস্তানি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। ব্রিটিশ সাংসদদের একটি দলও এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি পাঠিয়েছে।

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের বর্তমান আন্দোলন প্রমাণ করে যে কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রচারের ওপর ভিত্তি করে একটি অঞ্চলের মানুষকে দীর্ঘদিন দমন করে রাখা যায় না। পাকিস্তান যখন নিজের দেশের অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে ব্যর্থ, তখন PoK-এর ওপর এই নৃশংসতা তাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতিকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দিয়েছে। বুলেট বা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দিয়ে কাশ্মীরের মানুষের এই অধিকারের লড়াইকে কতদিন চেপে রাখা যাবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -