ধাব : কাঁটাযুক্ত লেজের এই টিকটিকি কেন বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু?

- Advertisement -

মরুভূমির রহস্যময় সরীসৃপ ‘ধাব’ তার কাঁটাযুক্ত লেজ, অসাধারণ আত্মরক্ষার কৌশল এবং কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতার জন্য বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্র। এটি মূলত উদ্ভিদভোজী এবং মরুভূমির বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কুসংস্কার ও অবৈধ শিকারের কারণে এই প্রাণী হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা এর সংরক্ষণে সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ধাব : কাঁটাযুক্ত লেজের এই টিকটিকি কেন বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু?

প্রচণ্ড রোদ, তপ্ত বালিয়াড়ি আর জলের চরম সংকট — এমন পরিবেশে বেশির ভাগ প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন। অথচ এই কঠোর পরিবেশেই বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে এক বিস্ময়কর সরীসৃপ। স্থানীয়ভাবে যার নাম ধাব। দেখতে সাধারণ টিকটিকির মতো হলেও এর জীবনযাপন, আত্মরক্ষার কৌশল এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন ধরে আকৃষ্ট করে আসছে।

ধাব মূলত শুষ্ক ও আধা-মরুভূমি অঞ্চলের বাসিন্দা। ভারতের পশ্চিমাঞ্চল, পাকিস্তানের কিছু এলাকা এবং আশপাশের শুষ্ক অঞ্চলে এদের দেখা যায়। দিনের বেলায় যখন মরুভূমির বালু আগুনের মতো গরম হয়ে ওঠে, তখন ধাব সাধারণত মাটির গভীরে তৈরি করা নিজের গর্তে আশ্রয় নেয়। সূর্যের তাপ কিছুটা কমে এলে এটি খাদ্যের সন্ধানে বাইরে বের হয়। এই সহজ অভ্যাসই তাকে তীব্র গরমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে।

ধাবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর মোটা ও কাঁটাযুক্ত লেজ। সাধারণ টিকটিকির লেজ সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ধাবের লেজ শক্ত ও ভারী। বিপদের সময় এটি সেই লেজকে ঢালের মতো ব্যবহার করে। কোনও শিকারি প্রাণী গর্তে ঢোকার চেষ্টা করলে ধাব লেজ দিয়ে আঘাত করে আত্মরক্ষা করে। প্রকৃতির এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিবর্তনের এক চমৎকার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও একটি বিস্ময়কর বিষয় হল, ধাব প্রধানত উদ্ভিদভোজী। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন বড় টিকটিকি মানেই ছোট প্রাণী শিকার করে খায়। কিন্তু ধাবের খাদ্যতালিকায় থাকে ঘাস, কোমল পাতা, ফুল, ফল এবং বীজ। ফলে এটি পরিবেশে বীজ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে এবং মরুভূমির উদ্ভিদজগতের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মরুভূমিতে জল অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য। তাই ধাবের শরীর এমনভাবে অভিযোজিত হয়েছে যে খুব অল্প জলেই দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। খাবার থেকে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা গ্রহণ এবং শরীরে জলের অপচয় কমানোর বিশেষ শারীরবৃত্তীয় ক্ষমতা এ প্রাণীকে কঠিন পরিবেশেও টিকিয়ে রাখে। এ কারণেই গবেষকরা একে মরুভূমির অন্যতম সফল অভিযোজিত প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেন।

ধাবের গর্তও কম বিস্ময়কর নয়। শক্তিশালী নখ দিয়ে এটি এমনভাবে সুড়ঙ্গ তৈরি করে, যেখানে বাইরের তাপমাত্রার তুলনায় অনেক কম গরম থাকে। এই গর্ত কেবল তার নিজের আশ্রয় নয়; অনেক সময় ছোট সরীসৃপ, পোকামাকড় কিংবা অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীও পরিত্যক্ত গর্ত ব্যবহার করে। ফলে একটি ধাবের বাসা ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

তবে ধাবকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হল নানা লোকবিশ্বাস। বহু বছর ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে যে ধাবের শরীর থেকে তৈরি তেল নাকি বিশেষ কিছু রোগ সারায় বা পুরুষের যৌনক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণায় এই দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, এসব বিশ্বাসের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

দুঃখজনকভাবে এই ভ্রান্ত ধারণার কারণেই ধাব বহু এলাকায় অবৈধ শিকারের শিকার হচ্ছে। শুধু লোকবিশ্বাস নয়, অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসাও এ প্রাণীর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি কৃষিজমির সম্প্রসারণ, আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এর সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেক এলাকায় ধাব আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়।

পরিবেশবিদদের মতে, ধাব কেবল একটি টিকটিকি নয়; এটি মরুভূমির বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এরা উদ্ভিদের বীজ ছড়ায়, বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ হিসেবে কাজ করে এবং মাটির নিচে গর্ত তৈরি করে পরিবেশের ক্ষুদ্র প্রাণীদেরও উপকার করে। কোনও অঞ্চলে ধাবের সংখ্যা কমে যাওয়া সেই এলাকার পরিবেশগত পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অনেক মরুভূমির পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে ধাব কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের আশা, ধাবের অভিযোজন কৌশল বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে চরম আবহাওয়ায় প্রাণীদের টিকে থাকার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধাবকে রক্ষা করতে হলে প্রথমেই ভাঙতে হবে কুসংস্কারের দেয়াল। মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বাড়ানো, অবৈধ শিকার বন্ধ করা এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করাই হতে পারে এ প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। ধাবও তার ব্যতিক্রম নয়। বাহ্যিকভাবে সাধারণ মনে হলেও এর জীবনযাপন, পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন এবং আত্মরক্ষার কৌশল আমাদের শেখায় — প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। তাই অলৌকিক গল্প নয়, বৈজ্ঞানিক সত্যের আলোতেই মরুভূমির এই রহস্যময় প্রাণীকে জানার এবং সংরক্ষণ করার সময় এখনই।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -