পশ্চিমবঙ্গে গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি রাজ্য সরকারের। বর্তমানে ১৪৮ জন সক্রিয় রোগী রয়েছেন। মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার কয়েকটি এলাকায় সংক্রমণ বেশি। ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস এবং নজরদারি চালানো হবে। বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। নভেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হবে।

বর্ষার মরশুমে পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বড় দাবি করল রাজ্য সরকার। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ভবনে ডেঙ্গি পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। তাঁর দাবি, এই মুহূর্তে রাজ্যে ১৪৮ জন ডেঙ্গি পজিটিভ রোগী রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ে অযথা আতঙ্কের প্রয়োজন নেই। তবে বর্ষা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত, বিশেষ করে নভেম্বর পর্যন্ত, নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ভবনের বৈঠকে রাজ্যের ডেঙ্গি পরিস্থিতি, মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পুরসভাগুলির ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে স্বাস্থ্য দফতরের পাশাপাশি কলকাতা ও হাওড়া পুরসভা এবং আরও একাধিক পুরসভার আধিকারিক, পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর, পরিবহণ ও সেচ দফতরের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষার বাকি সময়ে ডেঙ্গির সংক্রমণ যাতে নতুন করে না বাড়ে, তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।
আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম, দাবি রাজ্যের
সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এই সময় পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭,৬০০-এর বেশি। চলতি বছরে সেই সংখ্যা প্রায় ৪,০০০-এর কাছাকাছি। অর্থাৎ বছরের একই সময়ের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে সক্রিয় ডেঙ্গি পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ১৪৮।
তবে ডেঙ্গির ক্ষেত্রে শুধু মোট আক্রান্তের সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বর্ষার সময় মশার বংশবৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয় এবং সংক্রমণ অনেক ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের দিকে বাড়তে পারে। ফলে বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও আগামী কয়েক সপ্তাহ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকেও নভেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতির উপর নজর রাখার কথা বলা হয়েছে।
কোথায় বেশি নজর?
রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গির সংক্রমণ রয়েছে। মুর্শিদাবাদের নওদা এবং নদিয়ার চাকদহের মতো এলাকাকে বিশেষ নজরে রাখা হচ্ছে। আক্রান্তদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা ও সংলগ্ন বৃহত্তর কলকাতা এলাকার পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সরকারের দাবি, বৃহত্তর কলকাতার অধিকাংশ ওয়ার্ডে ডেঙ্গি সংক্রমণের ঘটনা নেই। তবে কয়েকটি ওয়ার্ডে আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। পুরসভাগুলিকে তাই জমা জল পরিষ্কার, মশার লার্ভা ধ্বংস এবং নিয়মিত নজরদারির উপর আরও জোর দিতে বলা হয়েছে।
৩, ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান
ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে পুরসভাগুলির ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। ৩, ৪ এবং ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুরসভা-সহ KMDA এলাকার বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর কথা জানানো হয়েছে। এই কাজে পুরসভার কর্মীদের পাশাপাশি পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মশার লার্ভা ধ্বংস করতে তরল লার্ভিসাইড ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ধোঁয়া বা ফগিং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে যাতে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর অপ্রয়োজনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না হয়।
জ্বরকে হালকা ভাবে না নেওয়ার বার্তা
স্বাস্থ্য দফতরের বৈঠকে জ্বরের রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা করানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দু’দিনের বেশি জ্বর থাকলে ডেঙ্গি পরীক্ষার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় টেস্ট কিটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং আক্রান্তদের পরিবারের সদস্যদেরও নজরদারির আওতায় আনা হবে।
এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য মূল সতর্কতা হল — বর্ষার সময়ে জ্বর হলে সেটিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ধরে নিয়ে অবহেলা না করা। ডেঙ্গির পাশাপাশি ম্যালেরিয়াও মশাবাহিত গুরুত্বপূর্ণ রোগ। তাই দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পরিসংখ্যান নিয়ে কেন সতর্ক থাকা দরকার?
ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি দাবির পাশাপাশি প্রকাশিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য-তথ্যে সংখ্যার কিছু পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে। যেমন, ১৯ আগস্ট পর্যন্ত স্বাস্থ্য দফতরের সূত্র উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদনে ৪,০৩৫টি ডেঙ্গি আক্রান্তের কথা বলা হয়েছিল এবং সাতটি মৃত্যুকে সরাসরি ডেঙ্গি-জনিত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গি পজিটিভ রোগীর অন্যান্য গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণে মৃত্যুর ঘটনাও আলাদাভাবে হিসাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় পর্যায়ের সরকারি ডেঙ্গি পরিস্থিতির তথ্যেও পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যা আলাদাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন তারিখে সংগৃহীত তথ্য, রিপোর্টিংয়ের সময় এবং মৃত্যুর শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় অমিল হতে পারে।
এই কারণে রাজ্য সরকারের “৫০ শতাংশ কম” দাবিকে আপাতত সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে করা দাবি হিসেবেই দেখা উচিত। একই সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে বলে সতর্কতা কমিয়ে দেওয়া যাবে না।
নভেম্বর পর্যন্ত নজরদারি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বৃষ্টির পরে বাড়ির ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মীয়মাণ বাড়ি, নর্দমা কিংবা জমে থাকা জলে এডিস মশার লার্ভা জন্মাতে পারে। তাই শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বা আক্রান্ত ব্যক্তির পরীক্ষা নয়, সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই পুরসভাগুলিকে পরিচ্ছন্নতা ও লার্ভা নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে বলা হয়েছে। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহে বৃষ্টির পরিমাণ, জমা জলের পরিস্থিতি এবং নতুন আক্রান্তের সংখ্যা — এই তিনটি বিষয় ডেঙ্গির প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, চলতি বছরে পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম — এমনটাই সরকারের দাবি। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে বলেও প্রশাসনের বক্তব্য। কিন্তু বর্ষা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে আপাত স্বস্তির পাশাপাশি সতর্কতাও বজায় রাখতে চাইছে স্বাস্থ্য দফতর। আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কোন দিকে যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

