পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বিরতির পর নতুন জনগণনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্ব-নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে, পাশাপাশি গণনাকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন। জাতিগত তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই জনগণনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান এবং সরকারি নীতিনির্ধারণে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

দীর্ঘ বিরতির পর পশ্চিমবঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ভারতের নতুন জনগণনা কার্যক্রম। ২০১১ সালের পর এটিই প্রথম জাতীয় জনগণনা, যা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্র সরকারের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী রাজ্যে স্ব-নিবন্ধন (Self-Enumeration) প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত পর্যায়ে প্রশিক্ষিত গণনাকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন। প্রশাসনের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জনগণনার কাজকে আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং স্বচ্ছ করে তুলবে।
ভারতের জনগণনা দেশের জনসংখ্যা, সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের সবচেয়ে বড় সরকারি উদ্যোগ। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি পরিকল্পনা এবং নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও এই জনগণনা রাজ্যের জনসংখ্যাগত চিত্রকে নতুনভাবে তুলে ধরবে।
ডিজিটাল জনগণনায় নতুন উদ্যোগ
এবারের জনগণনার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার। নাগরিকরা চাইলে নির্দিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে নিজেরাই প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে পারবেন। এই ব্যবস্থাকে স্ব-নিবন্ধন বা সেলফ-এনুমারেশন বলা হচ্ছে।
অনলাইন ফর্মে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, মাতৃভাষা, বাসস্থানের ধরন, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য জমা না দিলে পরবর্তী পর্যায়ে সরকারি গণনাকারীরা বাড়ি গিয়ে একই তথ্য সংগ্রহ করবেন।
ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর ফলে কাগজভিত্তিক কাজ অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি তথ্য যাচাই, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণের কাজও আগের তুলনায় দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের আশা।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ
স্ব-নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত গণনাকারীরা প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহ করবেন। তাঁরা নির্ধারিত সরকারি পরিচয়পত্র বহন করবেন এবং মোবাইল বা ট্যাবলেটভিত্তিক ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে তথ্য নথিভুক্ত করবেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের অনুরোধ করা হয়েছে, সঠিক ও নির্ভুল তথ্য প্রদান করতে এবং সরকারি পরিচয়পত্রধারী গণনাকারীদের সহযোগিতা করতে। ভুল তথ্য দিলে ভবিষ্যতে সরকারি পরিসংখ্যানের নির্ভুলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জাতিগত তথ্য সংগ্রহে নতুন সংযোজন
এবারের জনগণনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতিগত (Caste) তথ্য সংগ্রহ। দীর্ঘ সময় পর জাতীয় জনগণনায় এই তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিগত তথ্য দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিশ্লেষণে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প পরিকল্পনা, সংরক্ষণ নীতি এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নির্ধারণেও এ ধরনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রশাসন স্পষ্ট করেছে, নাগরিকদের দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য কঠোরভাবে গোপন রাখা হবে এবং আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র সরকারি পরিসংখ্যান তৈরির কাজে ব্যবহার করা হবে।
কেন জনগণনা গুরুত্বপূর্ণ
জনগণনা শুধু জনসংখ্যা গণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, হাসপাতাল নির্মাণ, নতুন সড়ক, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, গণপরিবহন, আবাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জনগণনার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া সংসদ ও বিধানসভা কেন্দ্র পুনর্নির্ধারণ, বিভিন্ন সরকারি অনুদান বণ্টন, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি, কর্মসংস্থান পরিকল্পনা এবং নগরায়ণ সংক্রান্ত গবেষণাতেও জনগণনার তথ্য ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং জনসংখ্যার পরিবর্তিত প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রেও এই জনগণনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
কোভিড-১৯-এর কারণে দীর্ঘ বিরতি
২০২১ সালে জনগণনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। ফলে প্রায় দেড় দশক পর আবার জাতীয় জনগণনা শুরু হওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এই দীর্ঘ ব্যবধানে দেশের জনসংখ্যা, নগরায়ণ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। নতুন জনগণনার মাধ্যমে সেই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র সামনে আসবে।
নাগরিকদের জন্য নির্দেশনা
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারি গণনাকারীর পরিচয় নিশ্চিত করে তবেই তথ্য প্রদান করতে হবে। তথ্য প্রদানের সময় সঠিক নাম, জন্মতারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করে জানানো উচিত।
অনলাইন স্ব-নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো অননুমোদিত ওয়েবসাইট বা ব্যক্তির কাছে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য সম্ভাব্য গুরুত্ব
পশ্চিমবঙ্গ দেশের অন্যতম জনবহুল রাজ্য। দ্রুত নগরায়ণ, সীমান্তবর্তী অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং মহানগর কলকাতাকে কেন্দ্র করে জনসংখ্যার পরিবর্তন বিশ্লেষণে এই জনগণনা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলার ভিত্তিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামোগত চাহিদার বাস্তব চিত্র পাওয়া গেলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হওয়া পশ্চিমবঙ্গের জনগণনা শুধু একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; এটি আগামী দিনের উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তি নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগ। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, স্ব-নিবন্ধনের সুযোগ এবং বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও নির্ভুল ও আধুনিক জনগণনা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতাই এই বৃহৎ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত।

