অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহার, নেতাজিকে নিয়ে কী বলেছিলেন তিনি?

- Advertisement -

অনন্ত মহারাজের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান প্রত্যাহার করেছে। নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলা এবং তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাওয়া এই সম্মান আগস্টেই বাতিল করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্তে পুরস্কারের মর্যাদা ও গরিমার সঙ্গে অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহার, নেতাজিকে নিয়ে কী বলেছিলেন তিনি?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ তথা গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনের নেতা অনন্ত মহারাজের বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই তাঁর কাছ থেকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান প্রত্যাহার করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ১৩ আগস্ট ২০২৬ এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, অনন্ত মহারাজের কাছে এই সম্মান থাকা পুরস্কারটির মর্যাদা, গরিমা ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অনন্ত মহারাজ নামে পরিচিত নগেন্দ্র রায় উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজে পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে তিনি বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। উত্তরবঙ্গের পৃথক প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক অধিকারের দাবিকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে পেয়েছিলেন বঙ্গবিভূষণ

২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সরকার অনন্ত মহারাজকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। রাজ্য ও রাজ্যবাসীর প্রতি তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়েছিল বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছিল। সেই সময় একজন বিজেপি সাংসদকে রাজ্য সরকারের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলেও যথেষ্ট আলোচনা তৈরি করেছিল।

কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর শুরু হয় প্রবল বিতর্ক।

কী বলেছিলেন অনন্ত মহারাজ?

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনন্ত মহারাজ নেতাজি সম্পর্কে অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল নেতাজিকে ‘ওয়ার ক্রিমিনাল’ বা ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে উল্লেখ করা। পাশাপাশি নেতাজির নেতৃত্ব এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

শুধু নেতাজিকে নিয়েই নয়, তাঁর বক্তব্যে আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদান এবং নেতাজির নেতৃত্বকে খাটো করে দেখানোর মতো মন্তব্য করেছেন বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

তাঁর বক্তব্যের আরও একটি অংশ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। অনন্ত মহারাজ কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকা এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সঙ্গে নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রসঙ্গকে তুলনা করেন। এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তীব্র চাপানউতোর।

কেন এত তীব্র প্রতিক্রিয়া?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নেতা। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আজাদ হিন্দ ফৌজকে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন তিনি।

ফলে নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলা বা তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের ভূমিকা নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে — এমন অভিযোগ সামনে আসতেই বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারও কড়া অবস্থান নেয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিতর্কিত মন্তব্যের ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপের বার্তা দেওয়া হয়।

শেষ পর্যন্ত বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহার

বিতর্কের মধ্যেই ১৩ আগস্ট রাজ্য সরকার অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সরকারি আদেশে সরাসরি কোনও একটি মন্তব্যকে একমাত্র কারণ হিসেবে উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, পুরস্কার দেওয়ার পরবর্তী সময়ে কিছু গুরুতর বিষয় সরকারের নজরে এসেছে। সেগুলি বিবেচনা করে সরকার মনে করেছে, অনন্ত মহারাজের কাছে বঙ্গবিভূষণ থাকা ওই সম্মানের মর্যাদা, গরিমা ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই অবিলম্বে সম্মানটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এর ফলে অনন্ত মহারাজ ভবিষ্যতে নিজেকে ‘বঙ্গবিভূষণ প্রাপক’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না বলেও সরকারি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে।

রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়

ঘটনাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। অনন্ত মহারাজ একজন বিজেপি রাজ্যসভার সাংসদ। অন্যদিকে, তাঁকে বঙ্গবিভূষণ দেওয়া হয়েছিল আগের সরকারের আমলে। ফলে একই বছরে একটি সরকারের দেওয়া সম্মান পরবর্তী সরকারের আমলে প্রত্যাহার হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

তবে পুরস্কার প্রত্যাহারের সরকারি ব্যাখ্যা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি মূলত বঙ্গবিভূষণ সম্মানের মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে, নেতাজিকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের মন্তব্য এখন শুধু একটি রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এর জেরে রাজ্যের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান প্রত্যাহারের মতো নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। নেতাজির ঐতিহাসিক ভূমিকা, তাঁর প্রতি জাতীয় আবেগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমারেখা—এই তিনটি বিষয়ই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -