নিউ মার্কেটের কাছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড : মৃত ৯, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন

- Advertisement -

কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে দুই মহিলা ও চার বছরের শিশুও রয়েছে। ধোঁয়ায় শ্বাসরোধেই অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। আগুনের কারণ ও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক বলেও জানা গেছে।

নিউ মার্কেটের কাছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড : মৃত ৯, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটে বুধবার ভোররাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে দুই মহিলা এবং চার বছরের একটি শিশুও রয়েছে। ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। পাঁচতলা ওই ভবনে একাধিক হোটেল চলত বলে জানা গিয়েছে। আগুন লাগার পর ঘন ধোঁয়ায় ভবনের ভিতরে আটকে পড়েন বহু আবাসিক। প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

গভীর রাতে আগুন, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত প্রায় পৌনে ২টো থেকে ২টোর মধ্যে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়। ভবনটিতে একাধিক হোটেল থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন অধিকাংশ আবাসিক। আগুনের পাশাপাশি ঘন কালো ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে দমকল, পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছোন। একাধিক দমকলের ইঞ্জিন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজে নামে। দমকলকর্মীরা ভবনের বিভিন্ন অংশে ঢুকে আটকে পড়া মানুষকে বের করে আনেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভবনে কুলিং ও তল্লাশি অভিযান চালানো হয়।

ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহতদের অনেকের শরীরে গুরুতর দগ্ধ হওয়ার চিহ্নের তুলনায় ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢোকার কারণে মৃত্যুর আশঙ্কাই বেশি। ঘন ধোঁয়া ভবনের ভিতরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ঘুমন্ত আবাসিকদের অনেকেই সময়মতো বেরোতে পারেননি।

মৃতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুই মহিলা এবং চার বছরের একটি শিশু রয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মৃতদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি

এই ঘটনায় নিহতদের নাগরিকত্ব নিয়েও দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, নিহত ৯ জনের মধ্যে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশের নাগরিক বলে বাংলাদেশ সরকারের তরফে নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর দাবি করা হয়েছে। ফলে মৃতদের সম্পূর্ণ পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে সরকারিভাবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের অপেক্ষা রয়েছে।

জানা গিয়েছে, মৃতদের মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। নিউ মার্কেট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাংলাদেশ থেকে আসা চিকিৎসাপ্রার্থীদের জন্য বহু বাজেট হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে।

অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভবনের কিছু ঘরে পর্যাপ্ত জানালা ছিল না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে আসার পথও যথেষ্ট ছিল না। সরু সিঁড়ি দিয়ে ধোঁয়ায় ভরা ভবন থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়ে।

এই ধরনের ঘিঞ্জি এলাকায় পুরনো ভবনের মধ্যে একাধিক হোটেল পরিচালনা কতটা নিরাপদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন করেছে কি না — তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার পর কলকাতার হোটেল ও লজগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

আগুনের কারণ এখনও নিশ্চিত নয়

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনও তদন্তাধীন। প্রাথমিক তদন্তে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে এটিকে এখনও চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের উৎস কোথায় ছিল, কীভাবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল এবং ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা বিধি ঠিক মতো মানা হয়েছিল কি না — সবদিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করছে। ভবনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা এবং হোটেল পরিচালনার অনুমোদনসহ একাধিক বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য রাজ্য সরকারের তরফে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠনের কথা জানানো হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পিছনে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না এবং ভবনটিতে হোটেল পরিচালনার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছিল — এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে।

এদিকে ঘটনার পর কলকাতার পুরনো ও ঘিঞ্জি এলাকার হোটেলগুলিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ভবনে একাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে, সেগুলিতে জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

আবারও সামনে এল নিরাপত্তার প্রশ্ন

কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পুরনো ভবনের মধ্যে হোটেল, গেস্টহাউস ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই মর্মান্তিক ঘটনা সেই প্রশ্নকেই আরও সামনে নিয়ে এল।

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গে হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় প্রশাসনের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ফলে কলকাতা এবং রাজ্যের অন্যান্য পর্যটন ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় থাকা হোটেল-লজগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে দ্রুত পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

তবে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঘটনার ক্ষেত্রে আগুনের সঠিক কারণ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবনটির অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তার নথিপত্রে কোনও অনিয়ম ছিল কি না — এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার পরই পাওয়া যাবে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -