G20 বৈঠকে চিনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ও রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশ বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকলেও চিন আপত্তি জানায়। ফলে সদস্যদের সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র চেয়ার’স স্টেটমেন্ট প্রকাশ করে। এই বিরোধ বিশ্ব বাণিজ্য, শুল্কনীতি, শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ-শৃঙ্খলে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর জোট G20-তে চিনকে ঘিরে নতুন করে তীব্র অর্থনৈতিক মতবিরোধ সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত G20 অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে চিনের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত, সস্তা পণ্যের রপ্তানী এবং তথাকথিত ‘নন-মার্কেট’ অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত চিনের আপত্তির কারণে সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি ‘Chair’s Statement’ প্রকাশ করা হয়েছে।
চিনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তই মূল বিতর্ক
বৈঠকে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল চিনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের দাবি, ২০২৫ সালে চিনের পণ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর বক্তব্য, এত বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী উদ্বৃত্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্যের জন্য টেকসই নয়।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চিনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা তুলনামূলক দুর্বল থাকায় দেশটি অতিরিক্ত উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভর করছে। এর ফলে চিনের বিপুল পরিমাণ পণ্য বিশ্বের অন্যান্য বাজারে প্রবেশ করছে এবং স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সৌর প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যে চিনের উৎপাদন ক্ষমতা ও রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, সরকারি ভর্তুকি ও অন্যান্য নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে চিনা সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে।
১৯টি দেশ সমর্থন করলেও আপত্তি চিনের
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, G20-এর ২০ সদস্যের মধ্যে ১৯টি দেশ চিনের মতো ‘নন-মার্কেট’ অর্থনীতি থেকে ক্রমাগত সস্তা পণ্য রপ্তানির বিষয়টি মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে একমত হয়েছিল। একমাত্র চিনই প্রস্তাবিত অবস্থানের বিরোধিতা করে।
এই মতপার্থক্যের ফলে ঐতিহ্যগত অর্থে একটি সর্বসম্মত G20 যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা যায়নি। G20-তে সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে সদস্যদের ঐকমত্য প্রতিফলিত করে একটি যৌথ communiqué প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এবার চিনের আপত্তি সেই প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করেছে।
পরিবর্তে মার্কিন G20 প্রেসিডেন্সি একটি Chair’s Statement প্রকাশ করেছে। সেখানে দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমানো এবং বাজারে বিকৃতি সৃষ্টি করে এমন নীতি পরিহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব কী?
যুক্তরাষ্ট্রের মূল বক্তব্য হল, যে দেশগুলোর দীর্ঘস্থায়ী ও বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে অতিরিক্ত রপ্তানি-নির্ভরতা থেকে সরিয়ে আনা প্রয়োজন।
বেসেন্ট G20 দেশগুলোকে নিজেদের শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় প্রয়োজনে বাণিজ্যিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন। তাঁর যুক্তি, চিনের সস্তা পণ্যের প্রবাহ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে অন্যান্য দেশের শিল্পক্ষেত্র আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বাণিজ্য নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে চিনা পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ওয়াশিংটন এখন চাইছে, অন্যান্য দেশও চিনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের শর্ত নতুন করে পর্যালোচনা করুক।
চিনের আপত্তি কেন?
চিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে সমর্থন করেনি। বেইজিংয়ের আপত্তির মূল জায়গা হল ‘নন-মার্কেট’ নীতি এবং বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার জন্য চীনকে দায়ী করার প্রবণতা।
চিনের দৃষ্টিতে, শুধুমাত্র বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ দেখে একটি দেশের অর্থনৈতিক মডেলকে সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে রাজনৈতিক চাপ বা একতরফা শুল্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।
ফলে G20-এর বিবৃতিতে এমন ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছে চিন, যা পরোক্ষভাবে তার শিল্পনীতি ও রপ্তানি মডেলকে লক্ষ্য করে। চিনের আপত্তির কারণেই শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত ভাষা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
শুধু চিন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিও বিতর্কে
তবে G20 বৈঠকে শুধু চিনের অর্থনৈতিক নীতি নিয়েই প্রশ্ন ওঠেনি। ইউরোপের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা চিনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘প্র্যাগম্যাটিক’ বা বাস্তববাদী অবস্থান বজায় রাখতে চায়। ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, মুক্ত বাণিজ্য সাধারণভাবে অর্থনীতির জন্য বেশি উপকারী এবং সব সমস্যার সমাধান হিসেবে বাণিজ্যিক বাধা আরোপ করা উচিত নয়।
অর্থাৎ G20-এর ভেতরে চিনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, চিনকে মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে সব দেশ একমত নয়।
ইউরোপের উদ্বেগও বাড়ছে
চিনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ঘাটতিও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চিনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৩৬০.৬ বিলিয়ন ইউরো-তে পৌঁছেছে। ফলে ইউরোপের মধ্যেও চিনের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তবে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের মতো সরাসরি ব্যাপক শুল্ক আরোপের পথে কতটা যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি অংশ চিনের সঙ্গে বাণিজ্য বজায় রেখেই প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
ভারতের জন্য কী বার্তা?
G20-এর এই বিরোধ ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। চিনের সস্তা শিল্পপণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় উৎপাদকদের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে চিনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বাণিজ্যিক বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খল ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের দামেও পরিবর্তন আসতে পারে।
ভারত একই সঙ্গে চিনের সঙ্গে বাণিজ্য করে এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোয় চিনকে ঘিরে পরিবর্তন ভারতের শিল্পনীতি, আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি কৌশলের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা
G20 বৈঠকে চিন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই মতপার্থক্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য বৈঠক ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। ফলে G20-এর এই বিতর্ককে ভবিষ্যৎ মার্কিন-চিন বাণিজ্য আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, G20-এর এবারের বৈঠক দেখিয়ে দিল — চিনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ও রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তবে চিনের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটি নিয়ে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে কঠোর অবস্থান এবং প্রয়োজনে বাণিজ্যিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। অন্যদিকে চিন এমন নীতির বিরোধিতা করছে, যা তার অর্থনৈতিক মডেলকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলতে পারে। এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব বাণিজ্য, শুল্কনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই G20-তে যৌথ বিবৃতি আটকে যাওয়া শুধু একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে চিনকে ঘিরে তৈরি হওয়া গভীর কাঠামোগত মতবিরোধেরও স্পষ্ট প্রতিফলন।

