ইয়েমেনে নতুন করে সংঘর্ষ তীব্র হওয়ায় মাত্র দুই সপ্তাহে প্রায় ১.১২ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায় বহু পরিবার দেশের অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পৌঁছেছেন। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো খাদ্য, জল, আশ্রয় ও চিকিৎসার প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।

ইয়েমেনে ফের ভয়াবহ সংঘর্ষের জেরে দ্রুত বাড়ছে মানবিক সংকট। দেশের পশ্চিম উপকূলজুড়ে নতুন করে লড়াই তীব্র হওয়ার পর মাত্র দুই সপ্তাহে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশের অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে ইয়েমেন ছেড়ে জিবুতিতে পৌঁছেছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) এবং শরণার্থী সংস্থা UNHCR-এর সর্বশেষ তথ্যেই পরিস্থিতির এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
পশ্চিম উপকূলে নতুন করে সংঘর্ষ
ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম উপকূলের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী ওই অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হুথিদের অগ্রগতির জবাবে সৌদি ও ইয়েমেনি বাহিনী হুথি অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। ফলে পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই সংঘর্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকা হল লোহিত সাগরের উপকূল। অঞ্চলটি বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় ইয়েমেনের সাম্প্রতিক সামরিক অস্থিরতার প্রভাব শুধু স্থানীয় মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
দুই সপ্তাহে লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত
IOM-এর জরুরি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ২০৮ জন নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই হিসাবের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ৮৬৩টি পরিবার রয়েছে। জুনে সংঘর্ষ তীব্র হওয়ার পর থেকে IOM-এর নথিভুক্ত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা আরও বেশি।
পরিস্থিতি এরপরও দ্রুত বদলেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে গত দুই সপ্তাহে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা অন্তত ১ লাখ ১২ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেদের বাড়ি, সম্পত্তি ও জীবিকার জায়গা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছেন।
অনেক পরিবারের জন্য এই বাস্তুচ্যুতি নতুন নয়। ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের কারণে বহু মানুষ আগেও একাধিকবার ঘরছাড়া হয়েছেন। এবার নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় তাদের আবারও নিরাপদ জায়গার খোঁজে বের হতে হচ্ছে।
ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পালাচ্ছে পরিবার
Reuters-এর প্রতিবেদনে এমন বাস্তুচ্যুত পরিবারের কথাও উঠে এসেছে, যারা গোলাবর্ষণ ও সংঘর্ষের মধ্যে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। কারও কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ার সুযোগ ছিল না, আবার কেউ নিজেদের গবাদিপশু ও অন্যান্য সম্পদ ফেলে পালিয়েছেন।
বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি বড় অংশ অস্থায়ী শিবির বা অন্য নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। সেখানে খাবার, বিশুদ্ধ জল, চিকিৎসা, স্যানিটেশন এবং নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে।
সমুদ্র পেরিয়ে জিবুতিতে পালাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ
সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে শুধু ইয়েমেনের ভেতরে নয়, দেশের বাইরেও পালানোর চেষ্টা করছেন বহু মানুষ। গত কয়েক দিনে প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পৌঁছেছেন বলে UNHCR জানিয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও উপসাগরীয় জলপথ পেরিয়ে জিবুতিতে যাওয়ার এই যাত্রাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। IOM জানিয়েছে, অনেক মানুষ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকায় করে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন এবং তাঁদের কাছে খাবার ও পানীয় জলের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত।
জিবুতি সরকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ১০ হাজার পর্যন্ত শরণার্থীর আগমন হতে পারে ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিপুল সংখ্যক নতুন মানুষের আগমন দেশটির স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
জ্বালানির সংকটেও বাধা পড়ছে পালানোর পথে
ইয়েমেনের ভেতরে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে যারা সমুদ্রপথে জিবুতিতে যেতে চাইছেন, তাঁদের অনেকের জন্য নৌযানের জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও অনেকে আটকে পড়ছেন।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আরও অনেক মানুষ ইয়েমেন ছাড়ার চেষ্টা করতে পারেন। এতে জিবুতির ওপর শরণার্থী গ্রহণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
আগে থেকেই ভয়াবহ মানবিক সংকটে ইয়েমেন
ইয়েমেন বহু বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন সংঘর্ষ সেই সংকটকে আরও গভীর করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য, নিরাপদ জল, চিকিৎসা, আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যবিধির ব্যবস্থা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ এবং আগে থেকেই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর কৌশলগত অবস্থান। বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
ফলে ইয়েমেনে সংঘর্ষ বাড়লে জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ইতিমধ্যেই লোহিত সাগর ও আশপাশের অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সামনে কী হতে পারে?
ইয়েমেনের পরিস্থিতি কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা এখনই বলা কঠিন। সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং জিবুতিসহ আশপাশের দেশগুলোর ওপরও শরণার্থীর চাপ তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং সংঘর্ষের কারণে আটকে পড়া মানুষের কাছে খাবার, জল, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা।
সব মিলিয়ে, মাত্র দুই সপ্তাহে ১.১২ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকটকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। দেশের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে থাকা মানুষের পাশাপাশি সমুদ্র পেরিয়ে পালিয়ে যাওয়া হাজার হাজার মানুষও এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। সংঘর্ষ যদি দ্রুত থামানো না যায়, তাহলে এই বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

