মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সত্ত্বেও সৌদি-হুথি সংঘাতে পাকিস্তান ও তুরস্ক এখনও সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার থাকলেও তাৎক্ষণিক সেনা পাঠানোর নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা প্রকাশ্যে নেই। পাকিস্তান সৌদির নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সতর্ক। তুরস্কও সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত ফের তীব্র আকার নিয়েছে। সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর পাল্টা বিমান হামলার খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যেই মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল, সেই চুক্তি অনুযায়ী ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা এখনও সরাসরি সৌদির সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসছে না কেন?
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। মক্কা চুক্তিতে তিন দেশ ঘোষণা করেছিল, তাদের যেকোনও একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তির উদ্দেশ্য হিসেবে যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকাশ্য চুক্তি ও পরবর্তী সরকারি বিবৃতিতে প্রতিটি হামলার পর মিত্র দেশগুলোকে অবিলম্বে সেনা পাঠাতে হবে — এমন নির্দিষ্ট সামরিক প্রক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি।
হুথিদের হামলা ও সৌদির পাল্টা অভিযান
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইয়েমেন সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে। হুথি বাহিনী সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে।
১৬ সেপ্টেম্বর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোনকে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেন, ড্রোনটি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয় এবং পবিত্র নগরীর নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। হুথিরা অবশ্য মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর ফলে মক্কা চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
পাকিস্তান কেন সরাসরি যুদ্ধে নামছে না?
পাকিস্তানের অবস্থান বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার পর মক্কা চুক্তির আওতায় কোনও তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি। পাকিস্তান চুক্তির প্রতি নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেও সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি।
এর পেছনে একাধিক কূটনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইয়েমেনে সরাসরি সেনা পাঠানো আর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করা এক বিষয় নয়। সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক প্রযুক্তি বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়া সম্ভব হলেও ইয়েমেনে স্থল বা সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়া অনেক বড় সিদ্ধান্ত।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে চায় না। হুথিরা ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনী যুক্ত হলে সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার হলেও ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই কারণে ইসলামাবাদ একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর পথও খোলা রাখতে চাইছে।
তুরস্কের অবস্থানও কেন সতর্ক?
তুরস্কের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একইভাবে সরল নয়। মক্কা চুক্তির অন্যতম অংশীদার হলেও আঙ্কারা এখনও ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযানে প্রবেশ করেনি।
তুরস্ক ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতেও দেশটি আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আগস্টে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তুরস্কের জন্য ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশের অর্থ হবে সংঘাতের একটি নতুন সামরিক ফ্রন্টে জড়িয়ে পড়া। তাই চুক্তির কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রাখা হচ্ছে।
মক্কা চুক্তি কি তাহলে দুর্বল?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। কারণ চুক্তিটি মাত্র আগস্টে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এর সাংগঠনিক কাঠামো এখনও তৈরি হচ্ছে।
৩১ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক কর্মকর্তারা ইস্তাম্বুলে মক্কা চুক্তির অধীনে প্রথম দিকের কৌশলগত বৈঠক করেন। তিন দেশ সেখানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার সিদ্ধান্ত নেয়। সৌদি আরবে একটি সচিবালয় গঠনের কথাও জানানো হয়েছে, যার প্রাথমিক নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পাকিস্তানের একজন মহাসচিবের ওপর থাকবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্প, যৌথ প্রযুক্তি ও উৎপাদন সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থাৎ চুক্তিটি এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে প্রতিটি সামরিক হামলার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট যৌথ বাহিনী মাঠে নামবে।
সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সাম্প্রতিক সংঘাত সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হুথিদের হামলা শুধু সীমান্তবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জ্বালানি পরিবহণ ব্যবস্থার ওপরও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ও বাব এল-মান্দেবের আশপাশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এর ফলে সৌদি আরবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের কাছে মক্কা চুক্তির গুরুত্ব কেবল সামরিক নয়, রাজনৈতিকও। রিয়াদ চাইছে আঞ্চলিক অংশীদারদের মাধ্যমে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বা অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, সৌদি ভূখণ্ডে হামলা আরও বড় আকার নিলে মক্কা চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও সক্রিয় হতে পারে। তৃতীয়ত, কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে হুথি-সৌদি সংঘাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হতে পারে।
এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সরকারি অবস্থান হল — চুক্তির প্রতি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কিন্তু হুথিদের হামলার পর কোনও তাৎক্ষণিক যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি।
তাই মক্কা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান ও তুরস্ক এখনই ইয়েমেনে সেনা পাঠাচ্ছে না — এর অর্থ চুক্তি বাতিল বা অকার্যকর হয়ে গেছে, এমনটা বলা যায় না। বরং চুক্তির সামরিক কাঠামো এখনও গড়ে উঠছে এবং একই সঙ্গে দুই দেশই নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করছে।
তবে হুথিদের হামলা যদি আরও বিস্তৃত হয় এবং সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নির্দিষ্ট সহায়তা চায়, তখন মক্কা চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা নতুন করে পরীক্ষা হবে। সেই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও তুরস্ক ঠিক কোন মাত্রায় সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ায়, সেটিই হবে এই নতুন প্রতিরক্ষা জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

