পশ্চিমবঙ্গের নাম কি তবে বদলাবে? ‘বাংলা’ ইস্যুতে ফের জোর রাজনৈতিক বিতর্ক

- Advertisement -

পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করার পুরনো দাবি কেরলের নাম ‘কেরলম’ হওয়ায় ফের আলোচনায় এসেছে। ২০১৮ সালে বিধানসভায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব পাস হলেও কেন্দ্রীয় অনুমোদন মেলেনি। বর্তমানে রাজ্যের বিজেপি সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম রাখার পক্ষেই অবস্থান করছে। ফলে আপাতত নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নাম কি তবে বদলাবে? ‘বাংলা’ ইস্যুতে ফের জোর রাজনৈতিক বিতর্ক

পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা’ করার পুরনো দাবি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কেরলের নাম ‘কেরলম’ করার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরই পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে ‘বাংলা’ করার কোনও তাৎক্ষণিক সরকারি সিদ্ধান্ত নেই। বরং রাজ্যের বর্তমান সরকার নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের দাবি অবশ্য নতুন নয়। কয়েক বছর ধরেই রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ করার দাবি জানিয়ে এসেছে তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। ২০১৬ সালে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ভাষায় রাজ্যের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় রাজ্যের নাম এককভাবে ‘বাংলা’ করার প্রস্তাবও পাস হয়। কিন্তু সেই প্রস্তাব সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।

কেন নাম পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল?

নাম পরিবর্তনের পক্ষে তৎকালীন রাজ্য সরকারের অন্যতম যুক্তি ছিল, ‘West Bengal’ নামটি ইংরেজি বর্ণমালার ‘W’ দিয়ে শুরু হওয়ায় জাতীয় স্তরের বিভিন্ন বৈঠক ও প্রশাসনিক আলোচনায় রাজ্যের প্রতিনিধিদের অপেক্ষাকৃত পরে বক্তব্য রাখার সুযোগ আসে। ‘Bangla’ নাম হলে বর্ণানুক্রমে রাজ্যের অবস্থান অনেকটা এগিয়ে আসবে — এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছিল।

এর পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে রাজ্যের পরিচয় আরও সরাসরি তুলে ধরার বিষয়টিও নাম পরিবর্তনের দাবির অন্যতম কারণ ছিল। ‘বাংলা’ নামটি রাজ্যের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ — এমন মতও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে।

তবে বিরোধীদের বক্তব্য ছিল, শুধু প্রশাসনিক বা বর্ণানুক্রমিক সুবিধার জন্য একটি রাজ্যের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। নাম পরিবর্তনের সঙ্গে বিপুল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সরকারি নথি সংশোধন এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে।

কেরলের ‘কেরলম’ নাম পরিবর্তনেই ফের প্রশ্ন

২০২৬ সালে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় কেরলের নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। কেরল বিধানসভা ২০২৪ সালে সর্বসম্মতভাবে রাজ্যের নাম ‘কেরলম’ করার প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। এরপর কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘কেরালা’ থেকে ‘কেরলম’ করার প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়।

পরবর্তীতে সংসদের দুই কক্ষেই সংশ্লিষ্ট বিল পাস হয়। ১৪ আগস্ট ২০২৬-এ রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ‘Kerala (Alteration of Name) Act, 2026’ আইনে পরিণত হয়েছে। নতুন আইনে নির্দিষ্ট সময়ের পর সরকারি ভাবে রাজ্যের নাম ‘কেরলম’ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কেরলের নাম পরিবর্তনের এই দ্রুত অগ্রগতি পশ্চিমবঙ্গের পুরনো ‘বাংলা’ প্রস্তাবকে আবারও রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেরলের নাম পরিবর্তনের দাবি যদি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় এগোতে পারে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা’ প্রস্তাব এতদিন কেন কার্যকর হয়নি?

এই প্রশ্ন ঘিরে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগও উঠেছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবকে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়েছে — এমন কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা সামনে আসেনি।

বদলে গিয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি

এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁকেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে ‘বাংলা’ নামের পুরনো প্রস্তাব নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থানও আগের তুলনায় আলাদা। বর্তমান বিজেপি সরকার রাজ্যের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আগের সরকারের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বরং ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য বজায় রাখার পক্ষে বর্তমান শাসক দলের নেতাদের বক্তব্য সামনে এসেছে।

অর্থাৎ, একসময় যে ইস্যুতে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, এখন তার চরিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমান রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে এই বিষয়ে একই ধরনের অবস্থান থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

নাম না বদলালেও ‘বাংলা’ ব্যবহারে জোর

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল — রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ না হলেও বাংলা ভাষার সরকারি ব্যবহারে জোর দিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি চিঠিপত্র, নাগরিক পরিষেবা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, আবেদনপত্র, শংসাপত্র, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে ‘বাংলা’ নামকে রাজ্যের সাংবিধানিক পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা এবং বাংলা ভাষাকে প্রশাসনের কাজে আরও বেশি ব্যবহার করা — এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

সাংবিধানিকভাবে নাম বদলের প্রক্রিয়া কী?

ভারতের সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও রাজ্যের নাম পরিবর্তনের ক্ষমতা সংসদের রয়েছে। তবে এই ধরনের বিল সংসদে উপস্থাপনের আগে রাষ্ট্রপতির সুপারিশ প্রয়োজন হয় এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভাকে তার মতামত জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়।

অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করতে হলে শুধু রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব পাস করলেই হবে না। কেন্দ্রীয় স্তরে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত সংসদে আইন পাস করতে হবে।

এই কারণেই ২০১৮ সালে বিধানসভায় ‘বাংলা’ নামের প্রস্তাব পাস হওয়ার পরও রাজ্যের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তিত হয়নি।

এখন কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের নাম অবিলম্বে ‘বাংলা’ হয়ে যাওয়ার কোনও ইঙ্গিত নেই। পুরনো প্রস্তাবটি রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে এলেও বর্তমান রাজ্য সরকারের অবস্থান আগের সরকারের থেকে আলাদা। ফলে নতুন করে বিধানসভায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অন্যদিকে কেরলের নাম পরিবর্তনের নজির ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যের পুরনো নাম পরিবর্তনের দাবিকে নতুন করে রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করার দাবি আপাতত রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হিসেবেই রয়েছে; রাজ্যের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তনের কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কেরলের ‘কেরলম’ নাম পরিবর্তনের পর বিষয়টি ফের আলোচনায় এলেও বর্তমান রাজ্য সরকারের অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়া — দুই দিকই এই ইস্যুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর

- Advertisement -