মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের সমাপ্তি বিশ্ব ফুটবলের এক যুগের অবসান। দুই দশকের ক্যারিয়ারে তিনি শুধু অসংখ্য গোল ও রেকর্ড গড়েননি, ফুটবলকে দিয়েছেন শিল্পের সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার নতুন সংজ্ঞা। একাধিক ব্যর্থতার পর আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জেতানো তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। প্রতিভা, অধ্যবসায় ও প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হয়ে মেসি কোটি ভক্তের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

একটি যুগের সমাপ্তি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকেরও বেশি সময় কাটানোর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের কয়েক সপ্তাহ পর তাঁর এই সিদ্ধান্ত সামনে আসে। তবে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা শিরোপা দিয়ে হয়নি ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে কোনও একটি ম্যাচের ফল দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক। শুরুটা ছিল অস্বাভাবিক — হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচে মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখেছিলেন তরুণ মেসি। সেই ঘটনা যে ভবিষ্যতের এক কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম অধ্যায়, তখন তা বোঝার উপায় ছিল না। ২১ বছর পর সেই অধ্যায় শেষ হল ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোলের বিশাল পরিসংখ্যান নিয়ে। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি গোল করা ফুটবলার।
কিন্তু মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্ব শুধু সংখ্যায় আটকে নেই। বরং তাঁর গল্পটি এমন এক যাত্রা, যেখানে ব্যর্থতা, সমালোচনা, হতাশা এবং শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য সাফল্য — সবকিছু একসঙ্গে মিশে আছে।
শুরুর মেসি : প্রতিভা ছিল, কিন্তু প্রশ্ন ছিল অনেক
জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম দিকের বছরগুলো ছিল প্রত্যাশা ও হতাশার মিশেল। ক্লাব ফুটবলে Lionel Messi তখন একের পর এক সাফল্য পাচ্ছেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় ট্রফি আসছিল না।
২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার — একটির পর একটি ব্যর্থতা মেসির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ফাইনালে হারের পরও তাঁর হাতে ছিল ব্যক্তিগত গোল্ডেন বল, কিন্তু শিরোপা ছিল না।
২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে আবার হারার পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর গল্পের শেষটা এভাবেই লেখা হবে। কিন্তু মেসি ফিরে আসেন। আর সেই প্রত্যাবর্তনই পরবর্তী সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
২০২১ : বদলে গেল গল্প
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ২০২১ সালে। ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা জেতে। মেসির হাতে ওঠে জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। এই একটি সাফল্য যেন দীর্ঘদিনের মানসিক বোঝা সরিয়ে দেয়। এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে Finalissima জয়ের পর আসে কাতার বিশ্বকাপ।
আর সেখানেই মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার পূর্ণতা পায়।
কাতার বিশ্বকাপ : কিংবদন্তির মুকুট
২০২২ বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণকেন্দ্র। সাত ম্যাচে সাত গোল করে এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুই গোল করার পাশাপাশি টাইব্রেকারেও গোল করেন তিনি।
শুধু শিরোপা নয়, পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও পান মেসি। সেই বিশ্বকাপের পর তাঁর নাম আর শুধু “সর্বকালের অন্যতম সেরা” বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মারাদোনার ছায়া পেরিয়ে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেন আলাদা একটি জায়গা।
২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং শেষ বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপ জয়ের পরও থামেননি মেসি। ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনা আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে। ফলে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ট্রফির তালিকায় যুক্ত হয় আরও একটি বড় সাফল্য।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এবারও আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছেছিল। তবে স্পেনের কাছে হেরে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। শেষ ম্যাচে শিরোপা না পেলেও মেসি টুর্নামেন্টে আটটি গোল করেন এবং বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১।
এরপরই আসে অবসরের ঘোষণা।
সংখ্যার বাইরেও মেসির সবচেয়ে বড় অবদান
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে যদি শুধু ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল বা চারটি বড় শিরোপায় সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে তাঁর আসল প্রভাবের বড় অংশই বাদ পড়ে যাবে।
মেসি ফুটবলকে দেখিয়েছেন, একজন খেলোয়াড়ের প্রভাব শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে গোলদাতা, প্লেমেকার, ড্রিবলার এবং দলের আক্রমণের প্রধান সংগঠক ছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গতি কিছুটা কমলেও খেলার বুদ্ধিমত্তা, পাসিং, মাঠ দেখার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে আরও কার্যকর করেছে।
বিশ্ব ফুটবলের নতুন প্রজন্মের কাছে মেসির সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই — শারীরিক শক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ফুটবলবোধ।
ব্যর্থতার পর ফিরে আসার শিক্ষা
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক তাঁর জয় নয়, বরং জয়ের আগে তাঁর ব্যর্থতা।
একাধিক ফাইনালে হার, জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা, দেশের সমর্থকদের সমালোচনা — সবকিছুর পরও তিনি ফিরে এসেছেন। সেই প্রত্যাবর্তনের পরই এসেছে কোপা আমেরিকা, Finalissima, বিশ্বকাপ এবং আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা।
অর্থাৎ মেসির গল্প শুধু প্রতিভার গল্প নয়; এটি অধ্যবসায় ও অপেক্ষার গল্পও। যে খেলোয়াড়কে একসময় বলা হতো, ক্লাব ফুটবলে যতই সফল হোন, আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কিছু করতে পারেননি — শেষ পর্যন্ত সেই মেসিই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল প্রজন্মের নেতা হয়ে উঠলেন।
একটি প্রজন্মের আদর্শ
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি তরুণ ফুটবলারের কাছে মেসি এখন শুধু একজন তারকা নন, অনুকরণীয় একটি চরিত্র। তাঁর বাঁ পায়ের জাদু, ড্রিবলিং, গোল এবং মাঠের সিদ্ধান্ত বহু তরুণকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
তবে মাঠের বাইরেও তাঁর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মেসির ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তুলনামূলকভাবে নীরব থাকা এবং নিজের হয়ে কথা বলতে ফুটবলকেই সামনে রাখা। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে তাঁর পরিবর্তন ছিল স্পষ্ট — শুরুর দিকের শান্ত, লাজুক তারকা থেকে তিনি পরিণত হয়েছেন দলের অভিজ্ঞ অধিনায়কে।
মেসির উত্তরাধিকার কোথায়?
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, ছয়টি বিশ্বকাপ এবং চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা নিয়ে। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোল ২১। আর্জেন্টিনার হয়ে ম্যাচ ও গোল — দুই ক্ষেত্রেই তিনি ইতিহাসের শীর্ষে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো পরিসংখ্যান নয়।
মেসি বিশ্ব ফুটবলকে দিয়ে গেছেন একটি বিশ্বাস — প্রতিভা যত বড়ই হোক, ব্যর্থতার পর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই একজন খেলোয়াড়কে কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
২০১৬ সালের সেই হতাশ মেসি এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির মধ্যে দূরত্বটা শুধু ছয় বছরের নয়; সেটি একটি মানসিক যাত্রার দূরত্ব।
তাই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির বিদায়কে কেবল একজন ফুটবলারের অবসর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক যুগের পর্দা নামা, যে যুগে কোটি কোটি মানুষ মাঠে একজন ফুটবলারকে দেখেনি শুধু — দেখেছে আনন্দ, হতাশা, প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত স্বপ্নপূরণের একটি দীর্ঘ গল্প।
মেসি চলে যাচ্ছেন, আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে আর নয়। কিন্তু তাঁর বাঁ পায়ের সেই নিখুঁত স্পর্শ, ফাইনালের চাপের মধ্যে শান্ত থাকা, হার থেকে ফিরে আসার মানসিকতা এবং বিশ্বকাপ হাতে তাঁর সেই হাসি — বিশ্ব ফুটবলের স্মৃতিতে থেকে যাবে বহু প্রজন্ম। মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ। কিন্তু মেসির গল্প শেষ নয়।

