জাপানের আইচি-নাগোয়া অঞ্চলে শুরু হয়েছে ২০২৬ এশিয়ান গেমসের প্রতিযোগিতা। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ১৯ সেপ্টেম্বর। ভারত ৫০৩ জন অ্যাথলিট নিয়ে ৩৬টি খেলায় অংশ নিচ্ছে। ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, শুটিং, বক্সিং, কুস্তি, ব্যাডমিন্টনসহ একাধিক ইভেন্টে ভারতের দিকে নজর থাকবে। তবে শুরুতেই ভারী বৃষ্টি ও সম্ভাব্য ঝড়ের কারণে কয়েকটি ইভেন্টের সূচি ও আয়োজনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এবারের আসরে নতুন ক্রীড়া ইভেন্টও রয়েছে।

জাপানের আইচি-নাগোয়া অঞ্চলে শুরু হয়ে গেল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর এশিয়ান গেমস ২০২৬। এটি এশিয়ান গেমসের ২০তম আসর। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ১৯ সেপ্টেম্বর, তবে ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল, ক্রিকেট এবং আরও কয়েকটি খেলায় প্রতিযোগিতা তার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রেও ক্রীড়া অভিযান শুরু হচ্ছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে।
আয়োজকদের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এবারের এশিয়ান গেমস চলবে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত। জাপানের আইচি প্রিফেকচার ও নাগোয়া শহরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিযোগিতা। এবারের আসরে ৪৩টি খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন খেলায় বিপুল সংখ্যক ইভেন্টে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াবিদরা পদকের জন্য লড়াই করবেন।
উদ্বোধন ১৯ সেপ্টেম্বর
এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে ১৯ সেপ্টেম্বর। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন দুপুর ১টা থেকে পরিচয় যাচাই শুরু হবে, দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে গেট খোলা হবে এবং বিকেল ৪টা থেকে শুরু হবে ওয়ার্ম-আপ পর্ব। মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা সন্ধ্যা ৬টায়।
তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই কয়েকটি ক্রীড়া ইভেন্ট মাঠে নেমে গিয়েছে। এর কারণ, এত বিপুল সংখ্যক ইভেন্টকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে কিছু খেলার সূচি আগে থেকেই রাখা হয়েছে। ফলে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকেই এশিয়ান গেমসের প্রতিযোগিতামূলক আবহ তৈরি হয়েছে।
ভারতের অভিযান শুরু
ভারতের জন্যও ১৭ সেপ্টেম্বর থেকেই এশিয়ান গেমসের অভিযান শুরু হচ্ছে। প্রথমদিকে নজরে রয়েছে টেকবল। এই খেলাটি ফুটবল ও টেবিল টেনিসের কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে তৈরি। বাঁকানো টেবিলের দুই পাশে খেলোয়াড়রা পা, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে বল নিয়ন্ত্রণ করেন। এবারের এশিয়ান গেমসে টেকবল অন্যতম নতুন আকর্ষণ।
এরপর ধীরে ধীরে ভারতের অন্যান্য দল ও ক্রীড়াবিদরা বিভিন্ন ইভেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন। ক্রিকেট, হকি, অ্যাথলেটিক্স, শুটিং, ব্যাডমিন্টন, বক্সিং, কুস্তি, তিরন্দাজি, ভারোত্তোলনসহ একাধিক খেলায় ভারতের অংশগ্রহণ রয়েছে।
ভারতের দলে ৫০৩ জন অ্যাথলিট
এবার ভারত পাঠিয়েছে ৫০৩ জন অ্যাথলিটের একটি বড় দল। এর মধ্যে ২৬৯ জন পুরুষ এবং ২৩৪ জন মহিলা ক্রীড়াবিদ রয়েছেন। তাঁরা মোট ৩৬টি খেলায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন। অ্যাথলিটদের পাশাপাশি রয়েছে কোচ, সাপোর্ট স্টাফ ও ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের দল।
২০২৩ সালের হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে ভারত ঐতিহাসিকভাবে ১০৭টি পদক জিতেছিল। সেই সাফল্যের পর এবারও ভারতীয় দলের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে। তবে প্রতিটি খেলায় প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় আগের সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা না করে ইভেন্টভিত্তিক পারফরম্যান্সের দিকেই নজর থাকবে।
অ্যাথলেটিক্সে ভারতের বড় দল রয়েছে। পাশাপাশি শুটিং, তিরন্দাজি, বক্সিং, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন ও ভারোত্তোলনের মতো খেলাগুলিও ভারতীয় সমর্থকদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকবে।
ক্রিকেটেও ভারতের লড়াই
এবারের এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট অন্যতম আকর্ষণ। পুরুষ ও মহিলা — দুই বিভাগেই ক্রিকেট রয়েছে। মহিলা ক্রিকেটে ভারতের অভিযান শুরু হওয়ার কথা ১৮ সেপ্টেম্বর আয়োজক জাপানের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনাল দিয়ে। আগের আসরে ভারত মহিলা ক্রিকেটে সোনা জিতেছিল। ফলে এবারও সেই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে আবহাওয়ার কারণে ক্রিকেটের শুরুতেই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও চিনের মহিলা কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ বৃষ্টির কারণে একটি বলও না গড়িয়ে বাতিল হয়ে যায়। মাঠ খেলার উপযোগী না থাকায় ম্যাচ আয়োজন সম্ভব হয়নি এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ পরবর্তী পর্বে জায়গা করে নেয়।
আবহাওয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এশিয়ান গেমসের শুরুতেই জাপানের আবহাওয়া আয়োজকদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নাগোয়া ও আশপাশের এলাকায় সম্প্রতি প্রবল বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জায়গায় পরিবহণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং কিছু প্রতিযোগিতার সময়সূচিতে পরিবর্তন বা বিলম্ব হয়েছে। কয়েকজন অ্যাথলিটকেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে তাঁদের থাকার জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যেই ট্রপিক্যাল স্টর্ম ডুজন (Dujuan) নিয়ে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী ঝড়টি জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে অবস্থান করছিল এবং কেন্দ্রীয় জাপানের দিকে এগোচ্ছিল। এর সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি প্রায় ৯০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা এবং ঝোড়ো হাওয়ার গতি আরও বেশি ছিল বলে Reuters জানিয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন আয়োজকরা।
খারাপ আবহাওয়া আরও খেলার সূচিতে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে খোলা মাঠে আয়োজিত ইভেন্টগুলির ক্ষেত্রে বৃষ্টি ও ঝড়ের প্রভাব বেশি হতে পারে।
অ্যাথলিটদের থাকার ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা
এবারের এশিয়ান গেমসে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল অ্যাথলিটদের থাকার ব্যবস্থা। আয়োজকরা আগের মতো বিশাল একটি আলাদা অ্যাথলিটস ভিলেজ তৈরি করেনি। খরচ কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিকল্প আবাসন ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্রুজ জাহাজ এবং অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এই ব্যবস্থা নিয়ে অংশগ্রহণকারী ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাকে বিভিন্ন জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে প্রতিদিন প্রতিযোগিতার ভেন্যুতে পৌঁছে দেওয়াও আয়োজকদের জন্য বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।
নতুন খেলা ও নতুন আকর্ষণ
এবারের এশিয়ান গেমস শুধু প্রচলিত খেলাগুলির জন্য নয়, নতুন প্রজন্মের খেলাগুলির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। টেকবলের পাশাপাশি নতুন ধরনের ক্রীড়া ইভেন্ট দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এবারের আসরে মোট ৪৩টি খেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াবিদদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণও এবারের আসরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এশিয়ান গেমস তাই শুধু পদকের লড়াই নয়, নতুন ক্রীড়া প্রতিভা তুলে ধরারও বড় মঞ্চ।
সামনে নজর থাকবে ভারতের দিকে
১৯ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর এশিয়ান গেমস আরও গতি পাবে। প্রতিদিনই বিভিন্ন ভেন্যুতে চলবে একাধিক ইভেন্ট। ভারতের জন্য বিশেষ আগ্রহ থাকবে অ্যাথলেটিক্স, শুটিং, তিরন্দাজি, বক্সিং, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন, হকি এবং ক্রিকেটে।
তবে এবারের আসরের শুরুতেই আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা আয়োজকদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগামী কয়েকদিনে ঝড়-বৃষ্টির পরিস্থিতি কীভাবে বদলায় এবং তার প্রভাব প্রতিযোগিতার সূচিতে কতটা পড়ে, সেটিও নজরে থাকবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার ক্রীড়া দুনিয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা। জাপানের আইচি-নাগোয়া থেকে আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে পদকের লড়াই। ভারতের ৫০৩ জন অ্যাথলিটও নিজেদের ইভেন্টে সেরাটা দেওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নামবেন। এবার নজর থাকবে—কতগুলি পদক নিয়ে ভারত এই আসর শেষ করতে পারে এবং নতুন কোন ক্রীড়া প্রতিভা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের পরিচয় তৈরি করেন।

